জুলাই গণ অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে চারি দিকে শুধু স্বজন হারানোর আর্তনাদ। বিশেষ করে ওই সময়ে রাজধানীতে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
যেখানেই ছাত্র-জনতার জটলা দেখা গিয়েছে, সেখানেই সংঘাত- সংর্ঘষে প্রাণহানি হয়েছে। এমনকি সেসব স্থানে আশপাশের ঘর-বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে কাউকে বেদম মেরেছে। কাউকে বসে আনতে না পেরে গুলি করে হত্যা করেছে।
গণ অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর আজিমপুরেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। দিনটি ছিল ১৮ জুলাই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুই।
এসময় সরকারি কোর্য়ার্টার থেকে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বের হচ্ছিলেন। নাম তার দুলাল মাহমুদ। বিল্ডিংয়ের মেইন গেইট বন্ধ থাকায় বের হতে পারছিলেন না। দারোয়ানও নেই যে, তালা খুলে বেন হবেন। এমন সময় পুলিশ এসে উপস্থিত।
পুলিশ কেচি গেইট খোলার জন্য বলেন দুলালকে। দুলাল জানালেন চাবি তার কাছে নেই। কোন কথা না বাড়িয়ে এলাপাতাড়ি গুলি করে দুলালের পেট ঝাঁজরা করে ফেলে রেখে যায় পুলিশ।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন শহিদ দুলাল মাহমুদের স্ত্রী ফারহানা রহমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোষ্ট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে
ফারহানা রহমান বলেন- “দুলালকে পুলিশ গুলি করে এক হাত সামনে থেকে, সরাসরি কোমরে পিস্তল তাক করে…সেদিন ছিল ওর জন্মদিন”
‘ওর সাথে যেদিন আমার দেখা হইছিল, সেইদিনের কথা এখনো মনে পড়ে। ওর প্রথম কথা ছিল, ‘আমি খুব গরিব ঘরের সন্তান। জীবনে অনেক কষ্ট করে বড় হইছি।’
দুলাল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এসিস্টেন্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতো। আমাদের বিয়ে হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর আদিয়াত ও আরিশা হয়।
সে এমন একজন মানুষ ছিল, ১৬ সালের পর থেকে মনে পড়ে না ও ছাড়া আমি কখনো আর কারো উপর ডিপেন্ডেন্ট ছিলাম। কোনো সমস্যায় পড়লে ওকে যখন বলতাম, ও শুধু বলতো, দেখতেছি। তারপর যেকোনোভাবে সেটা সমাধান হয়ে যাইত। সেই মানুষটা আজকে আমার উপর এতগুলা দায়িত্ব দিয়ে চলে গেছে!
১৮ জুলাই সন্ধ্যায় ও যখন বের হচ্ছিল, আমি নিষেধ করছিলাম। ও বকা দিয়ে বলতেছিল, ‘প্যানিক করতেছ কেন? নিচেই ত যাচ্ছি।’ তখন আমি ওকে বলছিলাম, ‘প্যানিকটা শুধু দেখতেছ, ভালোবাসাটা দেখতেছ না?’
স্পষ্ট মনে পড়ে, আমি খাটে বসা, আর ও পাশেই দাঁড়ানো। ভালোবাসার কথাটা বলার পর ও মুচকি একটা হাসি দিলো। এটাই শেষ হাসি। এই হাসি আমি সারাজীবন ভুলব না। এর কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ ওকে গুলি করে।
আজিমপুর মোড় থেকে তাড়া করে পুলিশ ছাত্রদেরকে সরকারি কোয়ার্টারের ভিতরে নিয়ে আসে। ও যেই বিল্ডিংয়ের নিচে বসে ছিল, সেই বিল্ডিংয়েও কিছু ছাত্র লুকায়। পুলিশ এসে গেইটের চাবি দিতে বলে। দুলাল শুধু এটুকুই বলে, চাবি আমার কাছে নাই। সেই মুহূর্তেই গুলি…
এর পরপর ও নিজেই আমাকে ফোন দেয়, আস্তে করে শুধু বলে, ‘গুলি লাগছে’।
নিচে গিয়ে যতক্ষণে পৌছাই, ততক্ষণে রাস্তা রক্তে ভরে গেছে। ওর সাদা টিশার্টটা লাল। এত রক্ত আমার জীবনে আমি আর দেখি নাই। ও আমার দিকে তাকায়ে ছিল, মনে হচ্ছিল চোখের ভাষায় বলতেছে, ‘তুমি আমাকে বারণ করছিলা’।
১৯ জুলাই সকালে, হসপিটালে ও মারা যায়। শরীরে রক্ত প্রায় ছিলই না, এত রক্ত গেছিল।
দুলাল গ্রামে একটা জায়গা কিনে রাখছিল। স্বপ্ন ছিল ওইখানে একদিন একটা বাড়ি করবে। ওর স্বপ্নের জায়গাতেই ওকে কবর দিয়ে আসছি।’
দেশ প্রতিবেদক 























