দলটির গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা আছে- ‘মহান আল্লাহ তা’য়ালা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই।’ এতে আরও বলা আছে- “আল্লাহ তা’য়ালা ব্যতীত আর কাহারও সম্মুখে মাথা নত করিবে না এবং কাহারও উদ্দেশ্যে মানত মানিবে না। কেননা এক আল্লাহ তা’য়ালা ব্যতীত ইবাদাত (দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা) পাইবার অধিকারী আর কেহই নাই।”
অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ব্যতিত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইহুদি, শিখসহ অন্যকোন ধর্ম বিশ্বাস বা ধর্মীয় প্রবর্তককে স্বীকার করেনা সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ধারার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি।
জামায়াতে ইসলামী’ আরবি শব্দ। ‘জামায়াত’ অর্থ দল, গোষ্ঠী, সম্মেলন বা গণসমাবেশ। আর ‘ইসলামী’ বলতে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মকে বোঝানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট দলটির সঙ্গে অন্য কোন অমুসলিমের একাত্মতা হতে পারেনা।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নেতাকর্মী বা তাদের আলেম-ওলামারাও বিভিন্ন সময় ওয়াজ-মাহফিল, সভা-সমাবেশে কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বেহেসতের দাওয়াত দিচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎ ইসলামের বাইরে গিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দীকে খুলনা-১ (দাকোপ–বটিয়াঘাটা) নির্বাচনী আসনে প্রার্থী দিয়েছে দলটি। এই সংসদীয় আসনটিতেও বেশিরভাগ সময়ে হিন্দু ধর্মালম্বীরা জয় পেয়ে আসছেন। গণমাধ্যমের খবর, ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী ২০০৫ সালে জামায়াতে ইসলামে যোগ দেন।
কৃষ্ণ নন্দী দলীয়ভাবে কুরআন ও সুন্নাহর আইন কায়েম করার প্রত্যয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ”হরে কৃষ্ণ হরি বোল, দাঁড়িপাল্লা টাইনে তোল” স্লোগানের মধ্যে দিয়ে হিন্দু ভোটার টানার কৌশল নিয়েছেন। ইসলামী শাসন কায়েমের দল জামায়াতের হয়ে প্রার্থীতা পেলেও এখন পর্যন্ত হিন্দু ধর্ম ছেড়ে প্রকাশ্যে মুসলিম ধর্মগ্রহণ করেননি। মানে তিনি মনেপ্রাণে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস রেখেই ভোটের মাঠে কুরআন ও সুন্নাহর আইন কায়েম করতে চান।
অন্যদিকে, দলটির লোগো থেকে আরবি হরফে ‘আল্লাহু আকবর’ সরে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে মনোনয়ন এবং বিপুল ভোটে জয় পান সর্বমিত্র চাকমা। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা চাকমা সম্প্রদায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ছাত্রশিবির যেহেতু ‘কুরআন ও সুন্নাহর আইন কায়েম করতে চায় তাতে বৌদ্ধ ধর্মের সর্বমিত্র চাকমাও হয়তো কুরআন ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণবিশ্বাস ও আস্থা এনেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত সর্বমিত্র ধর্মান্তরিত হয়ে প্রকাশ্যে শান্তির ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেননি।
বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহে শহরের সার্কিট হাউস ময়দানে এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান বলেছেন, ”কোরআন ও সুন্নাহর আইন বাংলাদেশে কায়েম হবে ইনশা আল্লাহ। এই আইন চালু করার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।”
জামায়াতের নেতাকর্মীরা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা ছাড়াও ভোটের মাঠে বেহেসতের দাওয়াত দিচ্ছেন। ইসলাম ধর্মে ইহকালে নামাজ আদায়, রোজা পালন সহ ভাল কাজ করলে প্রতিদানস্বরুপ পরকালে বেহেসতের কথা বলা আছে।
এছাড়া বেহেসতে ৭০ জন হুর (সুন্দরী নারী) পাওয়া যাবে। ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বা সঠিক পথে হাঁটতে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাও সেই বেহেসত সহ হুরের সন্ধান পেতে মানুষকে উদ্বদ্ধু করছেন। ইসলাম ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কৃষ্ণ নন্দী এবং সর্বমিত্র চাকমারাও কী কোরআন ও সুন্নাহর আইন মেনে বেহেসতের টিকিট সহ হুরের সন্ধানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে একাকার হয়েছেন, না নিজেদের ধর্মবিশ্বাসেই স্থির রয়েছেন?
জামায়াতের এমপি প্রার্থী ও সাবেক শিবির সেক্রেটারি শিশির মনির তার নির্বাচনী আসন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) একটি পূজামণ্ডপে গিয়ে রোজা ও পূজাকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ উল্লেখ করেছেন। অথচ আলেম-ওলামারা সবসময়ই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মূর্তি পূজার বিরোধিতা করে আসছে।
খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মূর্তি বা ভাস্কর্য বিরোধীতার কথাও বিভিন্ন সময় বলছেন আলেম-ওলামারা। আওয়ামী লীগ আমলে ঢাকায় ভাস্কর্য ভাঙতে গণবিস্ফোরণ ও সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল অনেককে। সেসব ভুলে গিয়ে রোজা ও পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে শিশির মনির কী তার হিন্দু অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ আগামীতে রোজার পরিবর্তে পূঁজা উদযাপন করে যাবেন?
মক্কায় অবতীর্ণ ‘সূরা আনকাবুত’ এর ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তির পূজা করছো আর মিথ্যা বানাচ্ছো।” কুরআন হাদীসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মূর্তি পূজাকে মিথ্যা বলা হলে জামায়াত ইসলামী পূজা পালনকারী ব্যক্তিদের নিজ দলের টানতে পারে? ইসলামের ব্যানারে রাজনীতি করলেও ভোটের মাঠে তাদের বৌদ্ধ ধর্মালম্বীও সমস্যা নাই। প্রশ্ন হলো দলটির লক্ষ্য কী- ‘কুরআন ও সুন্নাহর আইন করা’ নাকি ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থা অর্জন অথবা ধর্মকে পুঁজি করে ভোটের রাজনীতি?
ব্রেকিং নিউজ
জামায়াত ‘কুরআন ও সুন্নাহ’ আইন কায়েম করতে চায়!
-
হাসান জাভেদ, লন্ডন প্রবাসী সংবাদিক - প্রকাশ : ০২:৫৮:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- ১৪৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
হাসান জাবেদ
জনপ্রিয়
























