যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আশা বেশিক্ষণ টেকেনি। সমঝোতার অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র একযোগে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এক রাতেই অন্তত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় নির্ভুল আঘাত হানা হয়েছে। এর জবাবে কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।
নতুন এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা: মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে এবং হরমুজ প্রণালির অবাধ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই সর্বশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে কার্যকর যুদ্ধবিরতি আর বিদ্যমান নেই। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, হরমুজে হামলার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ভবিষ্যতে নতুন হামলা হলে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি:
মার্কিন হামলাকে সমঝোতা লঙ্ঘনের শামিল বলে দাবি করেছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এই হামলার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই দিতে হবে। অন্যদিকে আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিটি হামলার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
কোন কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে:
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে পরিচালিত অভিযানে ইরানের উপকূলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন অবকাঠামো, নজরদারি কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পরপর দুই দিনের অভিযানে প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, কোনারাক, জাস্ক, সিরিক, কেশম দ্বীপ, আবু মুসা দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে, দুই দিনের হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি কয়েকটি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি হাসপাতাল, বিমানবন্দরের অবকাঠামো এবং একাধিক রেলসেতু।
মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা:
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে।
লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটি, বাহরাইনের জুফাইর ও শেখ ইসা ঘাঁটি এবং কাতারের একটি সামরিক স্যাটেলাইট অবকাঠামো। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, হামলায় অন্তত একজন আহত হয়েছেন।
শান্তি আলোচনা কি ভেঙে পড়বে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ইঙ্গিত নয়; বরং আসন্ন আলোচনায় কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার দাফন শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সামরিক চাপ বাড়িয়ে আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছে উভয় পক্ষ।
ট্রাম্পের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে আরও বড় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া নতুন যুদ্ধ পরিচালনার বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের চাপও বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও ইরানকে কৌশলগতভাবে পিছু হটাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক অচলাবস্থাও আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশ ডেস্ক 















