বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেকেই ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে মনে করেন। কারণ, ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর দুই দলের কাছেই এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেকটা কমে যায়। তবে বাস্তবতা বলছে, এই ম্যাচ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; ব্যক্তিগত রেকর্ড, জাতীয় মর্যাদা, ফিফার কোটি কোটি ডলারের প্রাইজমানি এবং বাণিজ্যিক মূল্য—সব মিলিয়ে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ের গুরুত্ব কম নয়।
এবারের বিশ্বকাপে সেই ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ৩টায় মিয়ামি স্টেডিয়ামে শুরু হবে ম্যাচটি। সেমিফাইনালে হারের হতাশা কাটিয়ে দুই দলই এখন অন্তত তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।
এমবাপ্পের সামনে নতুন ইতিহাসের হাতছানি: এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত আকর্ষণ কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাঁর গোলসংখ্যা ৮। গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বলের দৌড়ে টিকে থাকতে এই ম্যাচে গোল করার সুযোগ পাচ্ছেন ফরাসি তারকা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি ফুটবলারের রেকর্ড গড়ার মঞ্চ হয়েছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কিংবদন্তি জ্যঁ ফন্তেইন জার্মানির বিপক্ষে চার গোল করে এক আসরে ১৩ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিলেন, যা এখনো অক্ষত রয়েছে।
দেশমের শেষ ম্যাচ, সম্মান নিয়ে বিদায়ের লক্ষ্য:
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের জাতীয় দলের দায়িত্বে এটিই শেষ ম্যাচ। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ফ্রান্সকে ২০১৮ বিশ্বকাপ শিরোপা, উয়েফা নেশন্স লিগের ট্রফি এবং একাধিক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে তুলেছেন।
দেশম বলেছেন, এটি কোনো প্রীতি ম্যাচ নয়। ফ্রান্সের জার্সির মর্যাদা এবং সমর্থকদের জন্য জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে তাঁর দল। যদিও বেশ কয়েকজন রিজার্ভ খেলোয়াড়কে সুযোগ দেওয়া হতে পারে, তবুও এমবাপ্পেকে শুরু থেকেই খেলানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
টুখেলের অকপট স্বীকারোক্তি:
ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলসেমিফাইনালের হতাশা লুকাননি। তাঁর ভাষায়, ‘এই ম্যাচ খেলতে কোনো ফুটবলারই চায় না।’
তবুও তিনি মনে করেন, পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চটাই দেবেন। নিয়মিত একাদশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন টুখেল। বেঞ্চের কয়েকজন খেলোয়াড় সুযোগ পেতে পারেন।
ইংল্যান্ডের জন্যও ম্যাচটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। জয় পেলে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এটিই হবে বিশ্বকাপে তাদের অন্যতম সেরা অর্জন।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের ইতিহাস:
বিশ্বকাপের প্রথম আসর ১৯৩০ সালে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল না। ১৯৩৪ সালে প্রথম এই ম্যাচ চালু হয়। এরপর ১৯৫০ বিশ্বকাপে ফরম্যাট পরিবর্তনের কারণে এটি অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫৪ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিয়মিতভাবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ছয়বার এই ম্যাচ খেলেছে জার্মানি, যার মধ্যে চারবারই জয় পেয়েছে তারা। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, উরুগুয়ে, পোল্যান্ড ও সুইডেন।
কোটি ডলারের লড়াইও বটে:
বর্তমান সময়ে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের বাণিজ্যিক মূল্য অত্যন্ত বেশি। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং দর্শকসংখ্যার কারণে এই ম্যাচ থেকেও বড় অঙ্কের আয় হয়।
ফিফার ঘোষিত প্রাইজমানি অনুযায়ী—
চ্যাম্পিয়ন: ৫০ মিলিয়ন ডলার
রানার্সআপ: ৩৩ মিলিয়ন ডলার
তৃতীয় স্থান: ২৯ মিলিয়ন ডলার
৪র্থ স্থান: ২৭ মিলিয়ন ডলার
অর্থাৎ তৃতীয় হওয়া দল চতুর্থ হওয়া দলের তুলনায় অতিরিক্ত ২ মিলিয়ন ডলার পাবে।
শুধু সান্ত্বনার ম্যাচ নয়: ফাইনালের আলোচনার আড়ালে পড়ে গেলেও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে থাকে সম্মান, রেকর্ড, ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাস এবং বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কারের লড়াই। এমবাপ্পের ব্যক্তিগত মাইলফলক, দেশমের বিদায়ী ম্যাচ এবং ইংল্যান্ডের মর্যাদার লড়াই—সব মিলিয়ে এবারও ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে পারে দারুণ আকর্ষণের।
দেশ ডেস্ক 
















