ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনের পতনের পর, রাজনৈতিক দলসহ অন্য অংশীজনদের মধ্যে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে সেই ঐক্যের জায়গায় ইতিমধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারে সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের বিষয়ে মতামত জানায়নি বড় দলগুলো। এর মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা শুরু হচ্ছে। ফলে দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে কি ঐকমত্য কমিশন, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানতে ও ঐকমত্যে পৌঁছাতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন কাজ শুরু করে। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন গত ৬ মার্চ ৩৭টি রাজনৈতিক দলের কাছে চিঠি ও ও ‘স্প্রেডশিট’ পাঠানো হয়েছে। ১৩ মার্চের মধ্যে তাদের মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের বিষয়ে মতামত পাওয়ার পরই আলোচনা শুরু করার কথা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হলেও পাঁচ সংস্কার কমিশনের ১৬৬ সুপারিশের বিষয়ে এখনো মতামত জানায়নি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ২৩টি দল। গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে মতামত জানিয়েছে ১৫টি দল। বিএনপি আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত এবং জামায়াত ও এনসিপি আরও কয়েক দিন সময় চেয়েছে।
মতামত জমা দেওয়া ১৩টি দল হলোÑ এলডিপি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), আমজনতার দল, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, বাংলাদেশ জাসদ, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি এবং নাগরিক ঐক্য।
এদিকে সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে আজ থেকে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রথম পর্যায়ে আজ বেলা ৩টায় এলডিপির সঙ্গে আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও কমিশন আগেই জানিয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাথমিক মতামত পাওয়ার পর দলগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা আলোচনা করা হবে। যারা ইতিমধ্যে মতামত দিয়েছেন, তাদের নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এরপর যারা মতামত দেবেন, ক্রমান্বয়ে তাদের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হবে।
অন্যদিকে সংস্কার আগে, নাকি নির্বাচন আগে-এ নিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব বাড়ছে। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এবং এর মিত্র দল ও জোটগুলোর বেশির ভাগই প্রয়োজনীয় সংস্কার সেরে দ্রুত নির্বাচন চাইছে। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নয়, দলীয় ৩১ দফার আলোকে মতামত জানানো হবে। নির্বাচন বিলম্বিত হতে পারে- এ শঙ্কায় গণপরিষদ, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ও প্রাদেশিক ব্যবস্থায় রাজি নয় তারা। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো চায়, শুধু নির্বাচনবিষয়ক সংস্কার অন্তর্র্বর্তী সরকার করবে; বাকিটুকু করবে নির্বাচিত সরকার।
জামায়াত সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন চায়। গণপরিষদে নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি তোলা এনসিপি জানিয়েছে, সুপারিশ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দলীয় মতামতে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এবং আগে গণপরিষদ নির্বাচনের মতামত থাকবে।
কমিশনের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, আগে ১৩টি দল মতামত জানিয়েছিল। মঙ্গলবার জেএসডি ও গণফ্রন্ট জানিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ১৩ মার্চের মধ্যে মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। বিএনপি ২০ মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়েছিল; কমিশন ১৮ মার্চের মধ্যে দিতে অনুরোধ করে। তবে দলগুলো মৌখিকভাবে আরও কিছুদিন সময় চেয়েছে।
কমিশন সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সময় চাওয়ার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টাকে জানানো হয়েছে। সরকারপ্রধানের কাছ থেকে জবাব এসেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই যেহেতু সংস্কার করা হবে, তাই তাদের জন্য অপেক্ষা করা হবে। কিন্তু কাজ এগিয়ে রাখতে যেসব দল মতামত জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে অসুবিধা নেই।
সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুদক এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মত এক করার লক্ষ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। ২২ রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ১৫ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে কমিশনের প্রথম সভা হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের সুপারিশের বিষয়ে আলাদা মতামত জানাবে। কতটুকু সংস্কার, কীভাবে হবে-এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হবে দলগুলোর মতামতে। প্রথমে দলগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে এবং পরে একসঙ্গে বৈঠক হবে। যেসব বিষয়ে একমত হবে, তা বাস্তবায়নে হবে জুলাই সনদ। এর মাধ্যমে দলগুলো অঙ্গীকার করবে, নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক; জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার হবে।
বাকি পাঁচ কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হলেও পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাহী ক্ষমতায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার করা হবে। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় পুলিশকে। প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত হতে পুলিশ চায় স্বাধীন কমিশন।
রাজনৈতিক দলগুলোর পাঠানো ‘স্প্রেডশিটে’ প্রতিটি সুপারিশের সঙ্গে ‘একমত’, ‘আংশিক একমত’ ও ‘ভিন্নমত’-এ তিনটি অপশন রয়েছে। ভিন্নমত থাকলে মন্তব্যের কলামে বিস্তারিত জানানোর সুযোগ রয়েছে। সংস্কার বাস্তবায়নে ছয়টি বিকল্প দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- ‘নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের সময় গণভোটের মাধ্যমে’, ‘গণপরিষদের মাধ্যমে’, ‘নির্বাচনের পরে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে’ এবং ‘গণপরিষদ ও আইনসভা হিসেবে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে’। এসব ঘরের যে কোনো একটিতে টিক চিহ্ন দিয়ে মত দিতে বলা হয়েছে।
অধিকাংশ রাজনৈতিক দল শুধু ‘টিক চিহ্ন’ দিয়ে মতামত জানাতে রাজি হয়নি। বিএনপি বিস্তারিত মত জানাচ্ছে দলটির ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে। তবে ‘স্প্রেডশিট’ও পূরণ করবে। যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র দলগুলোর মতো যেন অভিন্ন হয়, তা নিশ্চিতে কথা বলছে বিএনপি। দলটির সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার ভিত্তিতে ইতোমধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক তিনটি দল ঐকমত্য কমিশনে মতামত জানিয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিএনপিসহ বাকি মিত্ররা মতামত জানাবে। এর মাধ্যমে সংস্কার প্রশ্নে অভিন্ন মতামত দিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিতে চায় তারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘রাষ্ট্র সংস্কার করবে নির্বাচিত সংসদ’- এ অবস্থানের ভিত্তিতে মতামত তৈরি করা হচ্ছে। দলটির দৃষ্টিতে যেসব সংস্কারের এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই, সেগুলোতে মত নাও দিতে পারে। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ ও কাঠামো তৈরিতে সংবিধান এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিএনপি।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, সংবিধান না থাকলে গণপরিষদের প্রয়োজন হয়। অন্তর্র্বর্তী সরকার বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছে। নতুন সংবিধানের যেহেতু দরকার নেই, তাই গণপরিষদের প্রস্তাব অপ্রয়োজনীয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার প্রস্তাবে আপত্তি জানাবে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ টানা দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধের প্রস্তাব করবে দলটি। তবে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের প্রস্তাবে বিএনপি রাজি নয়। সংসদের মেয়াদ শেষে নির্বাচিত সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করবে- এ প্রস্তাবেও রাজি নয় বিএনপি। নির্বাচনকালীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনে সীমাবদ্ধের প্রস্তাবে ইতিবাচক দলটি। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ, দায়িত্ব ও ক্ষমতা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব স্পষ্টীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নেও একমত।
মতামত চূড়ান্ত করতে গত রোববার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের অধিকাংশ সুপারিশে একমত। তবে দলটির অভিমত হলো, সংবিধান সংস্কারের এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচিত সংসদের। নির্বাচিত সংসদই প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে। নির্বাচন ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে বিএনপি। দলীয় মতামত সংবাদ সম্মেলন করেও তুলে ধরা হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দলীয় মতামত প্রস্তুত করা হয়েছে। যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ, আলোচনা করা হচ্ছে। সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের বিস্তারিত মতামতের সঙ্গে স্প্রেডশিটও থাকবে।
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর পদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত জামায়াত। দ্বিকক্ষের বদলে বিদ্যমান পদ্ধতির সংসদ চায় দলটি। তবে জামায়াতের প্রস্তাব হবে, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করে আরও ১০ বছর বহাল রাখার পক্ষে জামায়াত।
শেখ হাসিনার পতন ঘটানো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের দল এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, গণপরিষদে নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবিতেই রয়েছে। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, দলীয় নেতারা মতামত নিয়ে কাজ করছেন। আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সব ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে জামায়াতে ইসলামী স্বাগত জানাবে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য থাকা উচিত। তাই সংস্কারে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর নির্বাচন হোক। ঐকমত্য কমিশনে মতামত দিতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে বলে তিনি জানান।
দেশ প্রতিবেদক 
















