বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) সময় সারা দেশে সব ধরনের সরকারি সহায়তা বিলিবণ্টন ও তদারকির দায়েত্বে ছিলেন প্রতিটি জেলায় একজন করে সচিব। তাদের এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে সচিবরা শত শত কোটি টাকার লোপাট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ তথ্য যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কোভিডের সময়ে সারা দেশে কয়েক দফা লকডাউন দেওয়া হয়। কর্মবিমুখ ও হতদরিদ্র মানুষকে সহায়তার জন্য জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা না নিয়ে তিনি ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স ভেঙে সচিবকে এসব কর্মকর্তা গ্রামের মানুষের তালিকা করা এবং তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনার ওই সময় যে ৬৪ সচিব সরকারি ত্রাণ ও টাকা বিলিবণ্টন এবং দুর্গতদের তালিকা করার দায়িত্বে ছিলেন তাদের ভূমিকা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার অলিগার্ক ওই আমলাদের ‘আমলনামা’র খতিয়ান পরী¶া-নিরী¶া চলছে। কট্টর আওয়ামী লীগার এবং ‘র’ এর এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী ওই সচিবদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
করোনায় লক ডাউনের সময় প্রান্তিক মানুষকে সরাসরি সহায়তার উদ্যোগের পর ত্রাণ ও টাকা বিতরণে প্রভাব বিস্তার, ডিসিদের উপর ¶মতার অপব্যবহার এবং জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরোধী দলের উপরে আক্রমণের সহযোগিতা আশ্বাসসহ জেলার উন্নয়ন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৬৪ জন সচিবের তথ্য সংগ্রহ করছে সরকার। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে তালিকা চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দুই কোটি মানুষকে তথা ¶তিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেয় তখনকার সরকার। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। কিন্ত ১৫ লাখ পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছানো যায়নি যথাযথ তথ্য ভান্ডারের অভাবে। পরে ¶তিগ্রস্ত এক লাখ কৃষককে এককালীন ৫ হাজার টাকা করে নগদের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। এ প্রে¶িতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও ¶তিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য, প্রতি জেলায় রাজনৈতিক নেতাদের বাদ রেখে একজন করে সচিবকে দায়িত্ব দিয়ে আদেশ জারি করেছিল ¶মতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আসলে বিষয়টি নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমরা চাই বর্তমান সরকার ও দুদক বিষয়টি ¶তিয়ে আসল রহস্য বের করবে।
জানা গেছে, দায়িত্ব পালন করা সচিবরা ছিলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম (মুন্সীগঞ্জ), আইসিটি বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম (কুমিল্লা), অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম (সিরাজগঞ্জ), জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন (চট্টগ্রাম), স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সাবেক সচিব হেলারুদ্দীন আহমদ (কক্সবাজার), জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব এবং নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান (শরীয়তপুর), পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার (মানিকগঞ্জ), প্রতির¶া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল (যশোর), কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম (লালমনিরহাট), গণপূর্ত সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার (গোপালগঞ্জ), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপ¶ের নির্বাহী চেয়ারম্যান (রাঙামাটি), প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সাবেক সচিব পবন চৌধুরী (লক্ষ্মীপুর), সড়ক বিভাগের সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম (শেরপুর), ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ (ফরিদপুর), জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবুল কাশেম (রাজশাহী), কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক সত্যব্রত সাহা (গাজীপুর), শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কেএম আলী আজম (বরিশাল), সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (বান্দরবান), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শেখ ইউসুফ হারুন (সাত¶ীরা), বিপিএটিসির রেক্টর মো. রকিব হোসেন (নারায়ণগঞ্জ), যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. আখতার হোসেন (মাদারীপুর), রেলসচিব সেলিম রেজা (পাবনা), পাটসচিব লোকমান হোসেন মিয়া (সিলেট), সমবায় সচিব রেজাউল আহসান (রংপুর), মুক্তিযুদ্ধ সচিব তপন কান্তি ঘোষ (বি.বাড়িয়া), খাদ্যসচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম (চুয়াডাঙ্গা), শি¶াসচিব মো. মাহবুব হোসেন (জামালপুর), মৎস্যসচিব রওনক মাহমুদ (পটুয়াখালী), স্বাস্থ্যশি¶া সচিব মো. আলী নূর (ঢাকা), পরিকল্পনা সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী (সুনামগঞ্জ), মো. নুরুল ইসলাম (দিনাজপুর), বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর বদরুন নেছা (নরসিংদী), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া (পিরোজপুর), পরিবেশ সচিব জিয়াউল হাসান (কুড়িগ্রাম), স্বাস্থ্যসচিব মো. আবদুল মান্নান (কিশোরগঞ্জ), প্রাথমিক ও গণশি¶া সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলম (নীলফামারী), কারিগরি ও মাদরাসা সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান (মৌলভীবাজার), ইআরডি সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন (বগুড়া), নৌসচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী (ফেনী), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয়) সচিব মো. কামাল হোসেন (খুলনা), পিপিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা আফরোজ (কুষ্টিয়া), শ্রমসচিব একএম আবদুস সালাম (নওগাঁ), আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী (নোয়াখালী), পরিসংখ্যান সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী (নাটোর), পিএসসি সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন (রাজবাড়ী), দুর্যোগ সচিব মোহাম্মদ মোসীন (চাঁদপুর), সংস্কৃতি সচিব মো. বদরুল আরেফীন (খাগড়াছড়ি),পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মো. মামুন আল রশীদ (হবিগঞ্জ), পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোছাম্মৎ নাসিমা বেগম (মাগুরা), পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দীক (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), জাতীয় দ¶তা উন্নয়ন কর্তৃপ¶ের চেয়ারম্যান দুলাল কৃষ্ণ সাহা (গাইবান্ধা), বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান (বরগুনা), তথ্য সচিব খাজা মিয়া (নড়াইল), পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস (টাঙ্গাইল), ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল (ঝিনাইদহ), বিমানসচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন (মেহেরপুর), ভূমি সচিব মোস্তাফিজুর রহমান (পঞ্চগড়), জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জাকিয়া সুলতানা (নেত্রকোনা), সমাজকল্যাণ সচিব মাহফুজা আখতার (বাগেরহাট), ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার (ঝালকাঠি), পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শরিফা খান (ঠাকুরগাঁও), পার্বত্য সচিব মোছাম্মৎ হামিদা বেগম (ময়মনসিংহ), ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোকাব্বির হোসেন (ভোলা) এবং মহিলা ও শিশুসচিব মো. সায়েদুল ইসলাম (জয়পুরহাট)। সচিবদের সকলেই অবসরে চলে গেছেন। এদের মধ্যে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় কেউ কেউ কারাগারে রয়েছেন। করোনাকালে দায়িত্ব পালনের সময় তাদের অনেকেই ¶মতা অপব্যহার করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। তাদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।
এদিকে ১১ কোটি নাগরিকের তথ্য বিক্রি করা ঘটনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। করোনার সময় আইসিটি বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম কুমিল্লা জেলার দায়িত্ব পালন করেছেন। ৬৪ জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক সচিবরা দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের ইচ্ছা মতো সাহায্য কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তৎকালীন সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের তাদের ওপর নির্ভরশীল হতো হয়। তাদের মাধ্যমে তালিকা প্রদান করতে হয়। তালিকাকে অনেকাংশে গুরুত্ব না দেওয়ায় লাখ লাখ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহায়তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। তাই কোন কোন জেলায় করোনা সহায়তায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে অভিযোগ ওঠে। তাছাড়া করোনায় সরকারি সহায়তার নামে বিশেষ সিন্ডেকেট গড়ে ওঠে। তাদের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তাদের ইচ্ছায় সবকিছু পরিচালিত হয়েছে। সহায়তার অর্থ পায়নি। অধিকাংশই পতিত সরকারের দালালরাই এসব একক সুবিধা নিয়ে নয়ছয় করেছে। এমন অভিযোগ তৎকালীন পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে করা হলেও বিষয়টি আমলে আনা হয়নি।
গত ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালিন সরকার গঠন হয়। পতিত সরকারের আমলে মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত শুরু করে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০২০ সালে ৬৪ জেলায় করোনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সহায়তায় দায়িত্ব পাওয়া ৬৪ জেলায় সচিবদের আমলনামা যাচাই করার সিদ্ধান্ত হয়।
দুদকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, করোনা কালে সচিবদের দায়িত্ব দিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় যে, ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, তাতে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের অনুসন্ধানে একটি টিম কাজ করছে।
বিশেষ প্রতিনিধি 
















