ঢাকা ০১:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এনসিপির বৈঠক

দৃশ্যমান হতে হবে সংস্কার ও বিচার

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশ : ০৩:৩৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৫
  • ৮৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থান কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, ক্ষমতা থেকে একটি দলকে সরিয়ে আরেকটি দলকে বসানোর পরিকল্পনা ছিল না। বরং কীভাবে রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তন করে, রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক এবং গুণগত সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে, এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল।

তাছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে সংবিধানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং এখানে প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তার মধ্য দিয়েই সাংবিধানিকভাবে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এ সংবিধান সংস্কার নয়; বরং নতুন করে লেখা উচিত বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শনিবার শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এনসিপির বৈঠকে এসব প্রসঙ্গ উঠে আসে। বৈঠকে ১২৯টি প্রস্তাবে একমত হয়েছে এনসিপি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনÑ কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। অপরদিকে এনসিপির আট সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাবেদ রাসিন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা।

এ সময় দেশের সংবিধান ভারতের প্রেসক্রিপশনে তৈরি বলে মন্তব্য করে এনসিপি নেতাদের দাবি, শেখ মুজিবের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিশ্চিত করতেই ৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। যা গেল ৫৪ বছরেও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো কাজে আসেনি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে বলেন, এর মধ্যে সংসদ সদস্যরা দল ও নির্বাচিত সরকারের দাসে পরিণত হন। তাই সংবিধান সংস্কার নয়; বরং নতুন করে লেখা উচিত।

যদিও দল গঠনের আগে থেকেই ৭২-এর সংবিধান নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। সংবিধানের চারটি মূলনীতির মধ্যে গণতন্ত্র ছাড়া আর কোনোটিরই পক্ষে নন দলটির নেতারা। তাদের মতে, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই তিনটি নীতির সঙ্গে কখনো দেশের মানুষের ঐকমত্য ছিল না।

বৈঠক শেষে সদস্য সচিব আখতার গণমাধ্যমকে বলেন, সংবিধানের আলোচনা করেছি। পুলিশ সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট এখনো কেন জমা হয়নি আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের কথা বলেছি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিরঙ্কুশের বিষয়ে কথা বলেছি। আমাদের ক্ষমতা হস্তান্তর যাতে ভালোভাবে হয় সে বিষয়ে কথা বলেছি।

তিনি বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তার আগে বিচার এবং সংস্কার সরকারকে দৃশ্যমান করতে হবে। এনসিপি মনে করে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার যে এজেন্ডা-ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, বিচার এবং সংস্কার দৃশ্যমান করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হবে। এটার জন্য যেটুকু সময় পাওয়া প্রয়োজন, সরকার সে সময়টুকু পেতে পারে। এর বাইরে সময় দেওয়া হবে না। বৈঠকে আমরা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলছি এবং বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের কথা বলছি। সেই প্রেক্ষাপটে কীভাবে সংবিধান পুনর্লিখন করা যায় এবং গণপরিষদ নির্বাচনের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ১২৯টি বিষয়ে একমত হয়েছি। আমরা নোট দিয়েছি। প্রোটেকশন অব সিটিজেন, পিসফুল ট্রান্সজেকশন অব পাওয়ার, সত্তর অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা হয়েছে সংসদকে আরও বেশি কার্যকরের জন্য। অনেকে মনে করেন, আমরা দুটি নির্বাচন চাই। আসলে আমরা একটি নির্বাচনই চাই। যার নাম হবে আইনসভার নির্বাচন। সেটা পরে গণপরিষদের মর্যাদা পাবে। কারণ যে কোনো সংশোধনী পরবর্তী সরকার চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যেমন-বিগত সরকারের ১৫তম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। গণপরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে করা আমাদের এখনকার সংশোধনীগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

সারোয়ার তুষার বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও একটি দলের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনে এই সংবিধান তৈরি হয়েছিল। আমরা দুটি নয়, একটি নির্বাচনই চাই, আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে আমরা আইনসভা নির্বাচনের পাশাপাশি গণপরিষদের স্ট্যাটাস নিয়ে হোক।

হান্নান মাসউদ বলেন, ৭২-এর সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ। তাই এটি নতুন করে লেখা হোক। বর্তমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে দলটির নেতারা বলেন; এটি একজন সংসদ সদস্যকে দলীয় দাসে পরিণত করে। এ ব্যাপারে আছে এনসিপির নিজস্ব প্রস্তাবনা। প্রয়োজনে সংসদে কণ্ঠভোটের বদলে গোপন ভোটের ব্যবস্থা রাখার পক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টি।

এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার বিষয়ে যে মতামত আমরা দিয়েছিলাম, সেই বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকে সব আলোচনা শেষ হয়নি, আলোচনা চলমান থাকবে। আমরা বলেছি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার করে আমরা গণতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রবেশ করতে পারব। দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না; একবার প্রধানমন্ত্রী হলে পরে রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না; সাংবিধানিক কাউন্সিল সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগ দেবে- এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানে মূলনীতির মাধ্যমে দলীয় মূলনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে। সংবিধানের মূলনীতির প্রয়োজন আছে কিনা, বিষয়টি বলেছি। বাহাত্তরের মূলনীতি এবং দলীয় মূলনীতি বাদ দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের কথা বইয়ে পড়েছি, কিন্তু যে আকাঙ্ক্ষায় জনগণের রাস্তায় নেমে আসা সে আকাঙ্ক্ষাগুলো বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি, ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার ফলেই ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। তাই আমরা চাই, এবারের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যেন কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়। এটা জাতির প্রতি আমাদের সবারই অঙ্গীকার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান আজকে বৈঠকে বসার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। যে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসককে পলায়ন করতে বাধ্য করেছিল বাংলাদেশের জনগণ। হাজারো মানুষের শাহাদাতবরণ ও আহত হওয়ার বিনিময়েই আজকের এই প্রেক্ষাপট। জনগণের ভিতরে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা অবশ্যই পূরণ করতে হবে।’

নাহিদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এনসিপি। যে দলের প্রধান শক্তি ও ভিত্তির জায়গাটা হচ্ছে এই দেশের তরুণরা। সেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যে বক্তব্য ছিল আমরা ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এই গণ-অভ্যুত্থান কেবল কোনো ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, ক্ষমতা থেকে একটি দলকে সরিয়ে আরেকটা দলকে বসানোর পরিকল্পনা ছিল না। বরং কীভাবে রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে এরকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল। যে সংস্কার করলে রাষ্ট্র কাঠামো গুণগত আমূল পরিবর্তন সম্ভব হবে। কারণ আমরা দেখেছি, বিগত সময়ে আমাদের সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ ঘটেছিল। আমাদের সংবিধানে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি কাঠামোর বীজ বপন ছিল। ফলে সেই রাষ্ট্র কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে যেই ক্ষমতায় যাক তার ভিতরেও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থাকবে, স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার প্রবণতা থাকবে। সেই জায়গায় রাষ্ট্রের সংস্কার, সংবিধান, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা এনসিপি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, এক নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন আমাদের কাজ সবাই মিলে যেন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারি। যেন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসন ফেরত না আসে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী রূপ নেয় এবং যেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সমস্ত নিপীড়ন মোকাবিলা করতে পারি। সেই ব্যবস্থাগুলোকে অপসারণ করতে পারি।

তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনগুলোর পক্ষ থেকে যে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আপনাদের কিছু একমত, কিছু ভিন্নমত আছে। আমরা একমতের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি, সেগুলো নিয়ে অগ্রসর হব। যেসব জায়গায় আংশিকভাবে একমত বা ভিন্নমত সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব এবং প্রয়োজনে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। কেননা আমরা চাই, জাতির আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করতে।

নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রাণবাজি রেখে লড়াই করে ফ্যাসিবাদী শাসককে পলায়ন করতে বাধ্য করেছেন। সেই বিজয়ের পাশাপাশি আপনারা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চান এবং আপনাদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।

এ দেশের ইতিহাসে বারবার গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, কী করে গণতন্ত্রের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে বিজয় অর্জিত হয়, সে বিজয়কে বিভিন্নভাবে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। রাষ্ট্রকে কীভাবে এক ব্যক্তির করতলগত করে একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল দেখেছি।

জনপ্রিয়

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এনসিপির বৈঠক

দৃশ্যমান হতে হবে সংস্কার ও বিচার

প্রকাশ : ০৩:৩৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৫

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থান কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, ক্ষমতা থেকে একটি দলকে সরিয়ে আরেকটি দলকে বসানোর পরিকল্পনা ছিল না। বরং কীভাবে রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তন করে, রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক এবং গুণগত সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে, এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল।

তাছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে সংবিধানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং এখানে প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তার মধ্য দিয়েই সাংবিধানিকভাবে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এ সংবিধান সংস্কার নয়; বরং নতুন করে লেখা উচিত বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শনিবার শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এনসিপির বৈঠকে এসব প্রসঙ্গ উঠে আসে। বৈঠকে ১২৯টি প্রস্তাবে একমত হয়েছে এনসিপি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনÑ কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। অপরদিকে এনসিপির আট সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাবেদ রাসিন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা।

এ সময় দেশের সংবিধান ভারতের প্রেসক্রিপশনে তৈরি বলে মন্তব্য করে এনসিপি নেতাদের দাবি, শেখ মুজিবের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিশ্চিত করতেই ৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। যা গেল ৫৪ বছরেও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো কাজে আসেনি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে বলেন, এর মধ্যে সংসদ সদস্যরা দল ও নির্বাচিত সরকারের দাসে পরিণত হন। তাই সংবিধান সংস্কার নয়; বরং নতুন করে লেখা উচিত।

যদিও দল গঠনের আগে থেকেই ৭২-এর সংবিধান নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। সংবিধানের চারটি মূলনীতির মধ্যে গণতন্ত্র ছাড়া আর কোনোটিরই পক্ষে নন দলটির নেতারা। তাদের মতে, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই তিনটি নীতির সঙ্গে কখনো দেশের মানুষের ঐকমত্য ছিল না।

বৈঠক শেষে সদস্য সচিব আখতার গণমাধ্যমকে বলেন, সংবিধানের আলোচনা করেছি। পুলিশ সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট এখনো কেন জমা হয়নি আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের কথা বলেছি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিরঙ্কুশের বিষয়ে কথা বলেছি। আমাদের ক্ষমতা হস্তান্তর যাতে ভালোভাবে হয় সে বিষয়ে কথা বলেছি।

তিনি বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তার আগে বিচার এবং সংস্কার সরকারকে দৃশ্যমান করতে হবে। এনসিপি মনে করে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার যে এজেন্ডা-ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, বিচার এবং সংস্কার দৃশ্যমান করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হবে। এটার জন্য যেটুকু সময় পাওয়া প্রয়োজন, সরকার সে সময়টুকু পেতে পারে। এর বাইরে সময় দেওয়া হবে না। বৈঠকে আমরা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলছি এবং বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের কথা বলছি। সেই প্রেক্ষাপটে কীভাবে সংবিধান পুনর্লিখন করা যায় এবং গণপরিষদ নির্বাচনের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ১২৯টি বিষয়ে একমত হয়েছি। আমরা নোট দিয়েছি। প্রোটেকশন অব সিটিজেন, পিসফুল ট্রান্সজেকশন অব পাওয়ার, সত্তর অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা হয়েছে সংসদকে আরও বেশি কার্যকরের জন্য। অনেকে মনে করেন, আমরা দুটি নির্বাচন চাই। আসলে আমরা একটি নির্বাচনই চাই। যার নাম হবে আইনসভার নির্বাচন। সেটা পরে গণপরিষদের মর্যাদা পাবে। কারণ যে কোনো সংশোধনী পরবর্তী সরকার চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যেমন-বিগত সরকারের ১৫তম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। গণপরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে করা আমাদের এখনকার সংশোধনীগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

সারোয়ার তুষার বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও একটি দলের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনে এই সংবিধান তৈরি হয়েছিল। আমরা দুটি নয়, একটি নির্বাচনই চাই, আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে আমরা আইনসভা নির্বাচনের পাশাপাশি গণপরিষদের স্ট্যাটাস নিয়ে হোক।

হান্নান মাসউদ বলেন, ৭২-এর সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ। তাই এটি নতুন করে লেখা হোক। বর্তমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে দলটির নেতারা বলেন; এটি একজন সংসদ সদস্যকে দলীয় দাসে পরিণত করে। এ ব্যাপারে আছে এনসিপির নিজস্ব প্রস্তাবনা। প্রয়োজনে সংসদে কণ্ঠভোটের বদলে গোপন ভোটের ব্যবস্থা রাখার পক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টি।

এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার বিষয়ে যে মতামত আমরা দিয়েছিলাম, সেই বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকে সব আলোচনা শেষ হয়নি, আলোচনা চলমান থাকবে। আমরা বলেছি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার করে আমরা গণতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রবেশ করতে পারব। দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না; একবার প্রধানমন্ত্রী হলে পরে রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না; সাংবিধানিক কাউন্সিল সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগ দেবে- এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানে মূলনীতির মাধ্যমে দলীয় মূলনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে। সংবিধানের মূলনীতির প্রয়োজন আছে কিনা, বিষয়টি বলেছি। বাহাত্তরের মূলনীতি এবং দলীয় মূলনীতি বাদ দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের কথা বইয়ে পড়েছি, কিন্তু যে আকাঙ্ক্ষায় জনগণের রাস্তায় নেমে আসা সে আকাঙ্ক্ষাগুলো বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি, ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার ফলেই ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। তাই আমরা চাই, এবারের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যেন কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়। এটা জাতির প্রতি আমাদের সবারই অঙ্গীকার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান আজকে বৈঠকে বসার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। যে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসককে পলায়ন করতে বাধ্য করেছিল বাংলাদেশের জনগণ। হাজারো মানুষের শাহাদাতবরণ ও আহত হওয়ার বিনিময়েই আজকের এই প্রেক্ষাপট। জনগণের ভিতরে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা অবশ্যই পূরণ করতে হবে।’

নাহিদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এনসিপি। যে দলের প্রধান শক্তি ও ভিত্তির জায়গাটা হচ্ছে এই দেশের তরুণরা। সেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যে বক্তব্য ছিল আমরা ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এই গণ-অভ্যুত্থান কেবল কোনো ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, ক্ষমতা থেকে একটি দলকে সরিয়ে আরেকটা দলকে বসানোর পরিকল্পনা ছিল না। বরং কীভাবে রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে এরকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল। যে সংস্কার করলে রাষ্ট্র কাঠামো গুণগত আমূল পরিবর্তন সম্ভব হবে। কারণ আমরা দেখেছি, বিগত সময়ে আমাদের সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ ঘটেছিল। আমাদের সংবিধানে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি কাঠামোর বীজ বপন ছিল। ফলে সেই রাষ্ট্র কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে যেই ক্ষমতায় যাক তার ভিতরেও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থাকবে, স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার প্রবণতা থাকবে। সেই জায়গায় রাষ্ট্রের সংস্কার, সংবিধান, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা এনসিপি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, এক নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন আমাদের কাজ সবাই মিলে যেন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারি। যেন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসন ফেরত না আসে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী রূপ নেয় এবং যেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সমস্ত নিপীড়ন মোকাবিলা করতে পারি। সেই ব্যবস্থাগুলোকে অপসারণ করতে পারি।

তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনগুলোর পক্ষ থেকে যে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আপনাদের কিছু একমত, কিছু ভিন্নমত আছে। আমরা একমতের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি, সেগুলো নিয়ে অগ্রসর হব। যেসব জায়গায় আংশিকভাবে একমত বা ভিন্নমত সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব এবং প্রয়োজনে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। কেননা আমরা চাই, জাতির আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করতে।

নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রাণবাজি রেখে লড়াই করে ফ্যাসিবাদী শাসককে পলায়ন করতে বাধ্য করেছেন। সেই বিজয়ের পাশাপাশি আপনারা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চান এবং আপনাদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।

এ দেশের ইতিহাসে বারবার গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, কী করে গণতন্ত্রের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে বিজয় অর্জিত হয়, সে বিজয়কে বিভিন্নভাবে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। রাষ্ট্রকে কীভাবে এক ব্যক্তির করতলগত করে একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল দেখেছি।