স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃক, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভরি ইমার্জেন্সি অ্যান্ড রেসপন্স বা বি-স্ট্রং প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে অভিযান শেষে এ কথা জানিয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।
এদিন সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি প্রধান কার্যালয়সহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৩৬টি কার্যালয়ে একযোগে অভিযান শুরু করে দুদক। সকাল ১০টা থেকে এ অভিযান শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। ঘুষ গ্রহণ, অনিয়ম, দুর্নীতি, গ্রাহকদের সেবা থেকে বঞ্চিত করা, অতিরিক্ত ফি আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগে এ অভিযান চালানো হয়।
যেসব জায়গায় অভিযান পরিচালনা হয়েছে সেগুলো হলো- চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, রাজশাহী, দিনাজপুর ও জামালপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়, বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়, বরিশালের মুলাদী, বগুড়ার শিবগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর, কক্সবাজারের রামু, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, গাজীপুর সদর, গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া, যশোরের বাঘারপাড়া, মাগুরার শ্রীপুর, খুলনার বটিয়াঘাটা, কিশোরগঞ্জ সদর, কুড়িগ্রামের উলিপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, শরীয়তপুরের জাজিরা ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়, নোয়াখালীর কবিরহাট, নওগাঁ সদর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পটুয়াখালী সদর, পিরোজপুরের নাজিরপুর, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ও রাঙামাটির কাপ্তাই এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়।
২০২৪ সালের বন্যা-পরবর্তী চট্টগ্রাম বিভাগের ছয় জেলাÑ ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য নেওয়া বি-স্ট্রং প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয় ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর আগেই প্রকল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম নির্ধারণ করার প্রমাণ পায় দুদক, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই অভিযান চালানো হয়।
প্রসঙ্গত, ভারতের বাঁধ উপচে এবং অতিবৃষ্টির কারণে ২০২৪ সালে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ অবস্থায় মানুষ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নেওয়া হচ্ছে একটি নতুন প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ‘বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভারি ইমার্জেন্সি প্রিপারেডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্রজেক্ট (বি-স্ট্রং) নামের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকার অর্থায়ন করবে।
অভিযান বিষয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা বলেন, বি-স্ট্রং প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেশি দেখানো হয়েছে। অভিযানে আমরা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করি। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে গত ২০ এপ্রিল। প্রকল্পের এখনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি, তবে প্রকল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের অতিরিক্ত দাম নির্ধারণের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরাও অনুসন্ধানে আসি। অভিযানের সময় এই প্রকল্পের ডিপিপি যিনি প্রস্তুত করেছেন তিনি কার্যালয় উপস্থিত ছিলেন না।
পাপন কুমার সাহা জানান, প্রকল্পের স্ট্রিট স্লোলার লাইট- একেকটার দাম ধরা হয়েছে ৭২ হাজার টাকা, অথচ পরিকল্পনা কমিশন জানায়, এই স্লোলার লাইটের প্রয়োজন নেই। ৬০টি মোটরসাইকেলের প্রস্তাব করা হলে পরিকল্পনা কমিশন থেকে ৩৬টি কেনার কথা বলা হয়। কম্পিউটার ল্যাপটপ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণসহ অন্যান্য ব্যয় দেখানো হয়েছে তা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলোÑ মাত্র চারটি ল্যাপটপের জন্য ১১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব, যা সন্দেহের উদ্রেক করেছে দুদকের তদন্তকারীদের মধ্যে।
এ প্রসঙ্গে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ আব্দুল মান্নান বলেন, আমাদের চিফ ইঞ্জিনিয়ার বর্তমানে ঢাকার বাইরে রয়েছেন। প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি; শুধু একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বরখাস্ত করা হয়। যেখানে অনিয়ম প্রমাণিত, সেখানেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলজিইডির প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে।
দেশ প্রতিবেদক 
















