প্রশাসনের প্রাণ সচিবালয়। ক্ষমতা পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মন্ত্রণালয়গুলোতে ব্যাপক রদবদল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে এ ধারার ব্যত্যয় ঘটেনি। চলছে ব্যাপক রদবদল। অনেক কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি, অনেককে করা হয়েছে ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসরেও পাঠানো হয়েছে অনেককে। সবকিছু মিলিয়ে সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে অনুমোদিত পদের অতিরিক্ত কর্মকর্তা পেয়েছেন সিভিল প্রশাসনে (সুপারনিউমারারি পদোন্নতি) পদোন্নতিও। ফলে নতুন কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রশাসন চালানোতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজের বা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
অভিজ্ঞ কর্মকর্তা সংকটে অনেকে কাজের ভারে ন্যুব্জ, সামলাতে হচ্ছে একাধিক অনুবিভাগ, অধিশাখা ও শাখার দায়িত্ব। কোনো কোনো পদে আবার কর্মকর্তা নেই। যদিও সহকারী সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে উপসচিব, যুগ্ম সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৫০ জনকে অনুমোদিত পদের বাইরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং ৭৬৪ জন প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত পদের সংখ্যা এবং পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদের মধ্যে বড় অমিল রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে ৩৮২ জন কর্মরত, যদিও অনুমোদিত পদ মাত্র ১২১টি। এর মধ্যে ১৪২ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে গত ২৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। যুগ্ম সচিব পর্যায়ে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট, মাত্র ২৭২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১ হাজার ৩৫ জন কর্মকর্তা এই পদে অধিষ্ঠিত। তার মধ্যে ৪১৯ জন গত আট মাসে পদোন্নতি পেয়েছেন। এছাড়া ৩৫০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে এখন ১ হাজার ৪০৪ জন কর্মকর্তা উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এবিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থায়ী পদের হিসাব বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা রয়েছে, এটি সঠিক নয়। কর্মকর্তার সংকট রয়েছে। এছাড়া গত কয়েক বছর বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় একটি শূন্যতাও তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেককে ওএসডি করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন কেউ কেউ। ফলে প্রশাসনে কর্মকর্তা সংকট তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক অতিরিক্ত সচিব একাধিক অনুবিভাগ, যুগ্মসচিব একাধিক অধিশাখা, উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব একাধিক অধিশাখা-শাখার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কেউ কেউ একসঙ্গে চারটি ডেস্কে দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্মকর্তা সংকট ও একজনের একাধিক দায়িত্ব থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাদের চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। তারা কাজে সঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারছেন না। হিমশিম খেতে হচ্ছে। এটি সার্বিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে প্রশাসনে। কাজে দেখা দিচ্ছে ধীরগতি।
৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক কারণে ১২৫ জনের মতো কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। এছাড়া অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, ছুটি এবং প্রেষণের মতো কারণে ওএসডিতে রয়েছেন।
তবে নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব জানান, একজনকে দিয়ে একাধিক অনুবিভাগের দায়িত্ব সামলালে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না, এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় দুই ডেস্কের কাজ সমন্বয়ে খুবই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিবের ১০টি, সচিবের ৭৯টি, অতিরিক্ত সচিবের ২১২টি, যুগ্মসচিবের ৫০২টি, উপসচিবের এক হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের এক হাজার ১৪৩টি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৩৭৯ জন, যুগ্মসচিব এক হাজার ৩৬ জন, উপসচিব এক হাজার ৪০৩ জন ও সিনিয়র সহকারী সচিব ২ হাজার ৩৬ জন। উপসচিব ছাড়া সব ক্ষেত্রেই কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি।
সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক কারণে ১২৫ জনের মতো কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। এছাড়া অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, ছুটি এবং প্রেষণের মতো কারণে ওএসডিতে রয়েছেন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ সম্প্রতি বলেন, ‘উপসচিব পদে কর্মকর্তা সংকট রয়েছে। তবে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব পদে অতিরিক্ত কর্মকর্তা রয়েছেন। একটু দেখে শুনে নিয়োগ দিতে হচ্ছে। আমরা একটু চুজি বেশি তো। আমরা চাই ভালো রেপুটেশনের (সুনাম) কর্মকর্তারা আসুক। খালি পদগুলোতে এমন ভালো কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার কাজ চলছে।একাধিক ডেস্কের দায়িত্ব থাকায় কর্মকর্তাদের একটু তো চাপ পড়ে। একই সঙ্গে যখন একাধিক ডেস্কের কাজ পড়ে কোনো কোনো কর্মকর্তার জন্য তো কঠিন হয়ে যায়। আমরা এ বিষয়ে শিগগিরই পদক্ষেপ নেব।
সাবেক সচিব ও গবেষক আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, নির্বাচারে পদোন্নতি দেওয়া সিভিল সার্ভিসের মান পতনের অন্যতম কারণ। এটি গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একটি কাঠামোগত পদোন্নতি ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দেন। সুপারনিউমারারি পদ হচ্ছে পদোন্নতি বা জনবল সমন্বয়ের সুবিধার্থে নিয়মিত কাঠামোর বাইরে তৈরি অস্থায়ী পদ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা আছে কথাটা সমভাবে সঠিক নয়। অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ তো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ধরে করা হয়। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থা আছে, সেখানে যে অতিরিক্ত সচিবের পদ আছে সেগুলো কিন্তু অনুমোদিত পদের হিসাবের মধ্যে নেই। এছাড়া ১ হাজার ১০০ প্রকল্প রয়েছে, এসব প্রকল্পের পিডিরা (প্রকল্প পরিচালক) কিন্তু অতিরিক্ত সচিব, তাদের হিসাব কিন্তু স্থায়ী পদের মধ্যে আসে না। কিন্তু এসব পদে তো আমাদের পদায়ন করতে হয়। যুগ্মসচিব ও উপসচিবের ক্ষেত্রেও এটা হয়। তাই পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা আছে, এটা বলা কঠিন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিভিল সার্ভেসের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে, প্রশাসন ক্যাডারই সবচেয়ে বেশি সুপারনিউমারারি পদোন্নতি পায়। পুলিশ, পররাষ্ট্র এবং ট্যাক্স ক্যাডারও কিছু পদোন্নতি পেয়ে থাকে। ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন যে, প্রশাসন ক্যাডারের প্রতি সরকারের অতিরিক্ত অনুকম্পা অন্য ক্যাডারের অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এর ফলে ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা জুলাই অভ্যুত্থানের পর সুপারনিউমারারি পদোন্নতির প্রতিবাদ করেছেন। তারপরও প্রশাসন ক্যাডারে পদোন্নতি অব্যাহত আছে।তারা অভিযোগ করেন যে তাদের নিয়মিত পদোন্নতির দাবি উপেক্ষা করা হলেও, প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে পদোন্নতি পাচ্ছেন। তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন, অনেকটা রাজনৈতিক সরকারের মতোই, একটি ক্যাডারকে অন্য ক্যাডারের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ৬ হাজার প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তার সুবিধার্থে, সরকার বাকি ২৫ ক্যাডারের প্রায় ৬০ হাজার কর্মকর্তাকে বৈষম্যের শিকার করছে, তাদের ন্যায্য পদোন্নতি উপেক্ষা করছে,’ বলেন সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের সমন্বয়কারী ফারুক। জানা গেছে, বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে, জানুয়ারিতে শিক্ষা ক্যাডারের ৭৬৫ জন কর্মকর্তাকে সুপারনিউমারারি ভিত্তিতে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, ৭ হাজারের বেশি ডাক্তারকে পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ব্রেকিং নিউজ
গুরুত্বপূর্ণ পদে ভালো কর্মকর্তা খোঁজা হচ্ছে
প্রশাসনে মন্থরগতি
-
দেশ প্রতিবেদক - প্রকাশ : ০২:৫৯:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ মে ২০২৫
- ৬১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয়

















