গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় হুঁশিয়ারি দিলেও বন্ধ হচ্ছে না মবের রাজত্ব। রাজনীতিবিদরা বলছেন, এ দেশে মবোক্রেসির হোতা পতিত আওয়ামী লীগ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার করতে হবে। বিচার ব্যতিরেকে ‘মব’ সৃষ্টি বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর দৃষ্টান্ত। এতে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এভাবে মব সৃষ্টির ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকলে এটি ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মবোক্রেসির মাধ্যমে সমাজে বিশৃঙ্খলা, আইনের শাসনের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হচ্ছে। যারা মব সৃষ্টি করছে, তাদের কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না?
রোববার দুপুরে ভয়ভীতি দেখিয়ে জনগণের ভোট ছাড়া নির্বাচন করার অভিযোগে সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএনপি। এই মামলার কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যায় ‘মব’ সৃষ্টি করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার উত্তরার বাসা ঘেরাও করে স্থানীয় কিছু ‘জনতা’। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয় উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। এর পর নুরুল হুদাকে মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়ার পর গ্রেপ্তার দেখানো হয় বিএনপির মামলায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক দল লোক ‘মব’ তৈরি করে নুরুল হুদাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। এ সময় ডিম ছুড়ে মারাসহ তাকে নানাভাবে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। কেউ কেউ ফেসবুক লাইভও করেন। এমন একটি লাইভে দেখা যায়, নুরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেন এক ব্যক্তি। তার গেঞ্জি ধরে রেখে বক্তব্য দিতে দেখা যায় ওই ব্যক্তিকে। এক ব্যক্তি জুতার মালা থেকে একটি জুতা নিয়ে নুরুল হুদাকে মারধর করেন। এ সময় ওই ব্যক্তির পাশে পুলিশের পোশাক পরা একজনকে দেখা গেছে। পরে পুলিশ জুতার মালাটি খুলে নিয়ে সাবেক সিইসিকে হেফাজতে নেয়। ওই সময় বাসার দরজার সামনে স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার নাম নিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়। আরেকটি ভিডিওতে নুরুল হুদাকে ঘিরে ধরে ‘স্বেচ্ছাসেবক উত্তর’-এর নামে স্লোগান দিতে শোনা যায় কথিত জনতাকে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ১/এ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন নুরুল হুদা। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক দল লোক ওই বাড়ির নিচে জড়ো হয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে নুরুল হুদার বাসায় ঢুকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় তাকে ঘেরাও করা হয়।
রাজনীতিবিদরা বলছেন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররাই এদেশে মবোক্রেসির জনক। তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের কথা বলে গণআদালত বসিয়ে প্রথম বড় ধরনের মবোক্রেসির ডেমনস্ট্রেশন করে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা গণকার্ফু জারি, জনতার মঞ্চ স্থাপন, সচিবালয়ে হামলা, অফিসগামীদের উলঙ্গ করার মাধ্যমে আন্দোলন নাম দিয়ে যে নৈরাজ্য চালিয়েছিল তা ছিল শতভাগ মবোক্রেসি।
যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হিসেবে ফাঁসি নির্ধারণ করে দিয়ে সেই রায় আদায়ের জন্য তারা শাহবাগের রাস্তায় টানা কয়েক মাস ধরে গণজাগরণ মঞ্চ নামে মবোক্রেসির চরম নজির সৃষ্টি করা হয়। যুদ্ধাপরাধ ও মুজিব হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের লাশের গাড়িতে আক্রমণ, জুতা ও ডিম নিক্ষেপ, জানাজা ও দাফনে বিপত্তি সৃষ্টি এবং কবরে হামলার ঘটনা ওরাই ঘটিয়েছে। রায় পছন্দ না হওয়ায় আদালত প্রাঙ্গণে বস্তি বসানো ও বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিলও আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদেরই কীর্তি। এগুলোকে তারা জনতার রুদ্ররোষ বলে প্রচার করেছে।
নুরুল হুদার মব ঘটনার সঙ্গে দলের কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে ‘ডিসিপ্লেনারি অ্যাকশন (শৃঙ্খলাবিরোধী ব্যবস্থা)’ নেবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমকে এ অবস্থানের কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা মব কালচারে বিশ্বাস করি না, আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছি। আমরা চাই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আদালতের রায় বাস্তবায়ন হবে, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার গ্রেফতার প্রক্রিয়া এবং তার বিচার প্রক্রিয়ায় আইনগতভাবে যথাযথভাবে পরিচালিত হবে এটা আমরা প্রত্যাশা করি। তবে তার ওপরে যে অবমাননাকর ব্যবহার করা হয়েছে এটা আমরা সমর্থন করি না।’
মবোক্রেসি সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে, আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা তৈরি হবে যে কোনো মূল্যে মব ঠেকানোর তাগিদ দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো বিচারিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করবে। একটা বিচারে গেছেন, বিচারটাকে যদি বিশ্বাস না করেন, নিজেরাই ‘মব জাস্টিস’ করতে থাকেন, তাহলে বিচার ব্যবস্থার আর দরকার কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে সেটির জন্য প্রচলিত আইন আছে। আইন অনুযায়ী সবকিছু হলেই সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। আইনের বাইরে গিয়ে এমন পরিস্থিতি কখনই কাম্য নয়। ‘মব জাস্টিসের’ নামে নৈরাজ্য কখনই গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় আইন কোনোভাবেই হাতে তুলে না দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। কিন্তু যারা এসব কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন উদাহরণও দেখা যাচ্ছে না।
সাবেক সিইসি নুরুল হুদাকে আটকের সময় যেভাবে মব জাস্টিস করা হয়েছে তা কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
সোমবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনায় বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যাকাণ্ড কীভাবে বেড়েছে তা উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক পরিসংখ্যানে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, গণঅভ্যুত্থানের মাস গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৬১ জন। গত বছরের শেষ ৫ মাসে ৯৬ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৬৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
আসকের তথ্যমতে, গণঅভ্যুত্থানের মাস আগস্টেই গণপিটুনিতে নিহত হন ২১ জন। পর্যায়ক্রমে সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ১৯, নভেম্বরে ১৪, ডিসেম্বরে ১৪, জানুয়ারিতে ১৬, ফেব্রুয়ারিতে ১১, মার্চে ২০ ও এপ্রিলে ১৮ জন নিহত হন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছে, কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা নিষ্পত্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সংবিধান ও আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া। বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে যেকোনো অপমানজনক ও সহিংস আচরণ শুধু ব্যক্তি-অধিকারকেই লঙ্ঘন করে না, তা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অপর এক এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলেছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ সংঘটিত করলে দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার করতে হবে। বিচার ব্যতিরেকে ‘মব’ বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর দৃষ্টান্ত। এ ধরনের আচরণ দেশের আইনি কাঠামো, মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ।
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনি বেড়েছে। কারণ দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এটা একটা অনিশ্চিত পথে যাত্রার মতো। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আইন মানছে না। মব সন্ত্রাস তৈরি হওয়াতে মানুষ গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য এর বিরুদ্ধে সরকার কার্যত দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে নজির পাওয়া যাচ্ছে না। মুখে মুখে অনেক কথা বলছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটি অনুপস্থিত।
ব্রেকিং নিউজ
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা জটিল করবে মব জাস্টিস
বন্ধ হচ্ছে না মব, দায় এড়াতে পারবে না সরকার
-
মাহমুদুল করিম - প্রকাশ : ০৩:২৬:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
- ৯৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জনপ্রিয়

















