২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐকমত্যের পরিবর্তে বাড়ছে উদ্বেগ ও শঙ্কা।
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। এই মৌলিক বিষয়টি নিয়েই এখন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে কূট চিন্তাটা নেই। নির্বাচনে জোর করা বা বলপ্রয়োগ ওই ধরনের কেউ নেই। এগুলো অনুপস্থিত থাকলেও নির্বাচন প্রশাসনের কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা এবং এই পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগ করা উচিত।
এছাড়া সম্প্রতি একটি সেমিনারে মঞ্জু সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকে ‘গণহত্যায় যুক্ত’ ও ‘গণধিকৃত’ আখ্যা দিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, তারা নির্বাচনে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই বক্তব্যটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ একটি প্রধান দলকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনের বাইরে রাখা হলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তিনি নির্বাচন কমিশনকে অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। এটি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা।
রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন ‘জুলাই সনদ’-এ সব দলের স্বাক্ষর করা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তিনি অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে ফাটল ধরানোর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং নেতাদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐকমত্যের দলিল হিসেবে ‘জুলাই সনদ’ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সনদকে দেখা হচ্ছিল একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের রোডম্যাপ হিসেবে। কিন্তু হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সনদে স্বাক্ষর নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, জুলাই সনদের মূল স্পিরিট ছিল একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা। কিন্তু এখন দুটি প্রধান বিষয়ে মতবিরোধ চরমে উঠেছে। প্রথমত, নির্বাচনি ব্যবস্থা কী হবে? প্রচলিত আসনভিত্তিক পদ্ধতি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ঝুঁকি থাকে। ফলে জার্মানির মতো ‘মিশ্র পদ্ধতি’ নিয়ে আলোচনা হলেও এর চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য নেই। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো, সাবেক ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অংশগ্রহণের প্রশ্ন। একটি অংশ চাইছে তাদের সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে, যা হবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। অন্য অংশ চাইছে আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার করতে, যা সময়সাপেক্ষ। এই দুটি বিষয়ে ঐকমত্য ছাড়া জুলাই সনদে স্বাক্ষর সম্ভব নয়।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এ বিষয়ে বলেন, আমরা জুলাই সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। আমরা মনে করি, আইনের চোখে যারা অপরাধী, তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু একটি দলকে ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করার পক্ষে আমরা নই। এতে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মানে হলো, সব বৈধ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সমান সুযোগ পাবে এবং প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিরপেক্ষ থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা বলেন, আমরা একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছি আরেকটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরির জন্য নয়। নির্বাচনে কে অংশ নিতে পারবে বা পারবে না, তা নির্ধারণ করবে আইন ও আদালত, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। যদি প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়, তাহলে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, দেশে এখনো নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়নি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা না গেলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এই বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে, অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট কতটা গভীর।
প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, সংকট উত্তরণের জন্য প্রধান উপদেষ্টাকেই সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, ড. ইউনূসের ওপর সব পক্ষেরই একটি আস্থা ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন মহল থেকে তার ওপর চাপ বাড়ছে। একদিকে যেমন এবি পার্টির মতো দলগুলো কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো একটি বাস্তবসম্মত সমাধান চাইছে। প্রধান উপদেষ্টাকে এখন ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’কে আরও সক্রিয় করে দ্রুত জুলাই সনদের বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। পাশের দেশে বসে ষড়যন্ত্রের যে কথা বলা হচ্ছে, তা যদি সত্যি হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও বেশি জরুরি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অর্থ শুধু নতুনদের সুযোগ দেওয়া নয়, পুরনোদের জন্যও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের অভাব। নির্বাচন প্রশাসন সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও, যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগীরা মুখোমুখি অবস্থান বজায় রাখে এবং সহিংসতা বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাতন্ত্র মিলে একটি ‘লৌহ ত্রিভুজ’ তৈরি হয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য বড় বাধা। এই ত্রিভুজ ভেঙে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। তবে তিনি আশাবাদী হওয়ার চেয়ে সর্বস্তরে সক্রিয় হওয়ার ওপর জোর দেন। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল একজনকে সরানো, কিন্তু এখন লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র বিনির্মাণ। এই বিনির্মাণের জন্য রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকলেও শিক্ষা, অর্থনীতি ও স্থানীয় সরকারের মতো বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
মাহমুদুল করিম খান 
















