ক্ষমতায় ফেরার পর সরকার ও দলের কার্যক্রমে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে—মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি। এর মধ্য দিয়ে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি কার্যকর করতে চায় দলটির হাইকমান্ড। ফলে জেলা, মহানগর, উপজেলা কিংবা অঙ্গসংগঠনের বহু শীর্ষ নেতা দলীয় পদ হারাতে পারেন বলে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সরকার পরিচালনা ও দলীয় কার্যক্রমকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে দলটি। সেই লক্ষ্যেই সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে মন্ত্রী ও এমপিদের জেলা-মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য সাংগঠনিক পদেও পরিবর্তন আনা হবে।
দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, একই ব্যক্তি সরকার ও দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলে কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। মন্ত্রী-এমপিরা প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কর্মকাণ্ডেও সময় দিতে পারছেন না। তাই কেউ কেউ স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিয়ে সরকার পরিচালনায় মনোযোগী হওয়ার চিন্তাভাবনাও করছেন।
এ লক্ষ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মডেলের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, জিয়াউর রহমান দল ও সরকারকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার নীতি অনুসরণ করতেন। তার সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা সাধারণত দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না। দল গোছানোর কাজে আলাদা নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।
দলের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতা দলীয় পদ ছেড়েছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। একইভাবে দলীয় পদ ছেড়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, আগামী কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে জেলা-মহানগর এবং অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় তাদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন থাকা জরুরি। মন্ত্রীরা প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ দিলে এবং অন্য নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, দল ও সরকার একাকার হয়ে গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তার মতে, সরকারের কাজ সরকার করবে এবং দল দলের দায়িত্ব পালন করবে—এটাই হওয়া উচিত।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে মন্ত্রী-এমপিরা নিজেরাই অনেক সময় জেলা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিতেন। এখনো সেই নীতি কার্যকর হতে পারে। তবে এটি কাউকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং দল ও সরকারকে কার্যকরভাবে পরিচালনার অংশ।
দলের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো সরকার ও দলকে একটি সমন্বিত গতির মধ্যে আনতে চান। তার ভাষায়, “দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই এখন মূল লক্ষ্য।”
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির গঠনতন্ত্রে ২০১৬ সালেই ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি যুক্ত করা হয়েছিল। এবার সেটির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যেতে পারে। এতে সরকারের দায়িত্বে থাকা নেতাদের প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ বাড়বে, পাশাপাশি সংগঠনেও নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে বলে মনে করছে দলটির হাইকমান্ড।
মাহামুদুল করিম খান 










