ঢাকা ০৪:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এস কে সুর ও ইনু পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের পাঁচ মামলা

শেখ সেলিমের কমিশন বাণিজ্য অনুসন্ধান শুরু

  • দেশ প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : ০২:৪৯:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ মার্চ ২০২৫
  • ৬২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। এছাড়াও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। রোববার (১৬ মার্চ) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশন থেকে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তথ্য জানান দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।
তিনি বলেন, ছয় কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও প্রায় ১২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু ও তার স্ত্রী আফরোজা হকের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুদক। প্রথম মামলায় সাবেক এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার ৫০৭ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৪টি ব্যাংক হিসাবে মোট ১১ কোটি ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ১৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী আফরোজা হক ও তার স্বামী হাসানুল হক ইনুর সহায়তায় নিজ নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭৪ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা তৎসহ মানিলন্ডারিং আইন ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী তার স্ত্রীর এবং কন্যার নামে পৃথক তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামি সিতাংশু কুমার সুর পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক দুর্নীতির আশ্রয়ে স্ত্রী ও কন্যার নামে ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উত্তোলনপূর্বক উহার অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা গোপনে স্থানান্তর/হস্তান্তর/রূপান্তর করে এক কোটি ৯৯ লাখ ৮৮ হাজার ১০১ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রায় ১,৬৯,৩০০ মার্কিন ডলার; ৫৫,০০০ ইউরো এবং ১০০৫.৪ গ্রাম স্বর্ণালংকার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় মোট পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯৭৯ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সুপর্ণা সুর চৌধুরী তার স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারসহ অবৈধ সহযোগিতায় ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক বৃহদাংকের অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চার কোটি ১০ লাখ ১৪ হাজার ৮২ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারা ও পেনাল কোডের ১০৯ ধারায় পৃথক একটি মামলা রুজু করা হয়।
এছাড়া নন্দিতা সুর চৌধুরী, তার বাবা সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর ক্ষমতার অপব্যবহারসহ পারস্পরিক সহযোগিতায় দুর্নীতির আশ্রয়ে ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক বৃহদাংকের অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৪ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বৈধ উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণভাবে মালিকানা অর্জনপূর্বক ভোগ দখলে রেখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় অভিযোগ সংশ্লিষ্ট (ক) নন্দিতা সুর চৌধুরী (খ) সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এ ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ধারা তৎসহ পেনাল কোডের ১০৯ ধারায় পৃথকভাবে আরও একটি মামলা রুজু করা হয়।
শেখ সেলিমের কমিশন বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানের ১৩০০ কোটি টাকা টাকার টেন্ডার কাজে পছন্দের ঠিকাদারের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন গ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম। টানা চারটি সংসদে ছিলেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। শেখ মুজিবের ভাগনে হওয়ার সুবাদে মন্ত্রিত্ব না থাকলেও স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি কাজের বড় অংশই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের সব উন্নয়নকাজ ভাগবাটোয়ারা করতেন তিনি। বিনিময়ে মিলত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সরকারি কাজের নিয়ম অনুযায়ী কোনো কাজের দরপ্রস্তাবের তথ্য গোপন থাকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাইরে অন্য কারো এটি জানার কথা নয়। কিন্তু শেখ সেলিম প্রতিটি উন্নয়নকাজের জন্য দরপ্রস্তাব জমা দেওয়া ঠিকাদারদের আর্থিক প্রস্তাবের তথ্য পেয়ে যেতেন এবং এরপরই কাজ দেওয়া ও কমিশন নেওয়ার সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বনানীতে শেখ সেলিমের বাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের হিসাব মিলেছে। বনানীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ওই নথিতে গোপালগঞ্জের ১১টি, চুয়াডাঙ্গার একটি, হবিগঞ্জের একটি, টাঙ্গাইলের একটি, ময়মনসিংহের একটি, ফরিদপুরের একটি, নাটোরের একটি, খুলনার তিনটি এবং রাজশাহীর দুটি প্যাকেজের দরপত্রের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নথির পাতায় পাতায় বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে নির্বাচিত ঠিকাদার, কাজ শেষ করার সময় ও কমিশনের হার উল্লেখ রয়েছে। ওই নথির অনুলিপিসহ একটি অভিযোগ দুদকে জমা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, গোপালগঞ্জেরই ১১টি উন্নয়নকাজ ১১ প্যাকেজে ভাগ করে ঠিকাদার নির্ধারণ হতো। এসব প্যাকেজে বাউন্ডারি ওয়াল, বিদ্যুতের সাব স্টেশন, গ্যালারি শেড, স্টেডিয়াম সংস্কার ও উন্নয়ন, হোস্টেল কাম অফিস ভবন, উইমেন স্পোর্টস কমপ্লেক্সে জিমনেসিয়াম, স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সে গ্যালারি চেয়ার স্থাপনসহ নানা নির্মাণকাজের তথ্য রয়েছে। যার মধ্যে বিএফএল/এইচএলসি-জে/ভি নামে ১২ কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার; কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১১ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার; মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১০ কোটি ২২ লাখ ৫৬ হাজার; এ, এস-এ এটকো- জে/ভি নামে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মার্কেন্টাইল কর্পোরেশনের নামে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার, বিএফএল-এএলসিএল জে/ভি নামে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার, কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার, মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১১ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের বাইরে চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও নাটোরের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে।

Tag :
জনপ্রিয়

এস কে সুর ও ইনু পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের পাঁচ মামলা

শেখ সেলিমের কমিশন বাণিজ্য অনুসন্ধান শুরু

প্রকাশ : ০২:৪৯:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ মার্চ ২০২৫

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। এছাড়াও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। রোববার (১৬ মার্চ) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশন থেকে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তথ্য জানান দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।
তিনি বলেন, ছয় কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও প্রায় ১২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু ও তার স্ত্রী আফরোজা হকের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুদক। প্রথম মামলায় সাবেক এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার ৫০৭ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৪টি ব্যাংক হিসাবে মোট ১১ কোটি ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ১৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী আফরোজা হক ও তার স্বামী হাসানুল হক ইনুর সহায়তায় নিজ নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭৪ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা তৎসহ মানিলন্ডারিং আইন ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী তার স্ত্রীর এবং কন্যার নামে পৃথক তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামি সিতাংশু কুমার সুর পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক দুর্নীতির আশ্রয়ে স্ত্রী ও কন্যার নামে ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উত্তোলনপূর্বক উহার অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা গোপনে স্থানান্তর/হস্তান্তর/রূপান্তর করে এক কোটি ৯৯ লাখ ৮৮ হাজার ১০১ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রায় ১,৬৯,৩০০ মার্কিন ডলার; ৫৫,০০০ ইউরো এবং ১০০৫.৪ গ্রাম স্বর্ণালংকার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় মোট পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯৭৯ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সুপর্ণা সুর চৌধুরী তার স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারসহ অবৈধ সহযোগিতায় ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক বৃহদাংকের অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চার কোটি ১০ লাখ ১৪ হাজার ৮২ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন এবং ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ধারা ও পেনাল কোডের ১০৯ ধারায় পৃথক একটি মামলা রুজু করা হয়।
এছাড়া নন্দিতা সুর চৌধুরী, তার বাবা সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর ক্ষমতার অপব্যবহারসহ পারস্পরিক সহযোগিতায় দুর্নীতির আশ্রয়ে ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক বৃহদাংকের অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধে অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় জমা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৪ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বৈধ উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণভাবে মালিকানা অর্জনপূর্বক ভোগ দখলে রেখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় অভিযোগ সংশ্লিষ্ট (ক) নন্দিতা সুর চৌধুরী (খ) সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এ ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ধারা তৎসহ পেনাল কোডের ১০৯ ধারায় পৃথকভাবে আরও একটি মামলা রুজু করা হয়।
শেখ সেলিমের কমিশন বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানের ১৩০০ কোটি টাকা টাকার টেন্ডার কাজে পছন্দের ঠিকাদারের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন গ্রহণ করার সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম। টানা চারটি সংসদে ছিলেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। শেখ মুজিবের ভাগনে হওয়ার সুবাদে মন্ত্রিত্ব না থাকলেও স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি কাজের বড় অংশই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের সব উন্নয়নকাজ ভাগবাটোয়ারা করতেন তিনি। বিনিময়ে মিলত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সরকারি কাজের নিয়ম অনুযায়ী কোনো কাজের দরপ্রস্তাবের তথ্য গোপন থাকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাইরে অন্য কারো এটি জানার কথা নয়। কিন্তু শেখ সেলিম প্রতিটি উন্নয়নকাজের জন্য দরপ্রস্তাব জমা দেওয়া ঠিকাদারদের আর্থিক প্রস্তাবের তথ্য পেয়ে যেতেন এবং এরপরই কাজ দেওয়া ও কমিশন নেওয়ার সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বনানীতে শেখ সেলিমের বাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের হিসাব মিলেছে। বনানীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ওই নথিতে গোপালগঞ্জের ১১টি, চুয়াডাঙ্গার একটি, হবিগঞ্জের একটি, টাঙ্গাইলের একটি, ময়মনসিংহের একটি, ফরিদপুরের একটি, নাটোরের একটি, খুলনার তিনটি এবং রাজশাহীর দুটি প্যাকেজের দরপত্রের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নথির পাতায় পাতায় বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে নির্বাচিত ঠিকাদার, কাজ শেষ করার সময় ও কমিশনের হার উল্লেখ রয়েছে। ওই নথির অনুলিপিসহ একটি অভিযোগ দুদকে জমা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, গোপালগঞ্জেরই ১১টি উন্নয়নকাজ ১১ প্যাকেজে ভাগ করে ঠিকাদার নির্ধারণ হতো। এসব প্যাকেজে বাউন্ডারি ওয়াল, বিদ্যুতের সাব স্টেশন, গ্যালারি শেড, স্টেডিয়াম সংস্কার ও উন্নয়ন, হোস্টেল কাম অফিস ভবন, উইমেন স্পোর্টস কমপ্লেক্সে জিমনেসিয়াম, স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সে গ্যালারি চেয়ার স্থাপনসহ নানা নির্মাণকাজের তথ্য রয়েছে। যার মধ্যে বিএফএল/এইচএলসি-জে/ভি নামে ১২ কোটি ২৩ লাখ ৯৯ হাজার; কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১১ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার; মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১০ কোটি ২২ লাখ ৫৬ হাজার; এ, এস-এ এটকো- জে/ভি নামে ৯ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মার্কেন্টাইল কর্পোরেশনের নামে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার, বিএফএল-এএলসিএল জে/ভি নামে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার, কিউ এইচ মাসুদ অ্যান্ড কোং নামে ১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার, মেসার্স আনাম ট্রেডার্সের নামে ১১ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের বাইরে চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও নাটোরের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে।