মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে যে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে বাংলাদেশেও একই মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্ডিয়ান, ইউরেশীয় এবং বার্মিজ-এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করা বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। তবে ফায়ার সার্ভিসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকা উচ্চঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
শনিবার (২৯ মার্চ) ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৮ মার্চ মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পর পর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭.৭ ও ৬.৪। ফলে দেশ দুটি বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশেও একই মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য সব পর্যায়ে পূর্বপ্রস্তুতি প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স।
শুক্রবার ৭.৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে মিয়ানমারের মান্দালয়। ১০ কিলোমিটার গভীরতার এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছে। যদিও দেশে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু ৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বহু প্রাণহানি হয়েছে। প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্ডিয়ান, ইউরেশীয় এবং বার্মিজÑএই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করা বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট ক্রমগত উত্তর দিকে সরতে থাকায় মধুপুর ও ডাউকি ফল্টে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা ৭ মাত্রা বা এরচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, এই মাত্রার ভূমিকম্প যদি ঢাকার কাছাকাছি কোথাও আঘাত হানে, তাহলে কী ঘটবে?
বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ হলেও কমিউনিটি এবং ভবন নির্মাণের মূল তদারকির জায়গায় কাজ হচ্ছে না। এছাড়া ভূমিকম্প ঘটে গেলে এরপরের ধাপে করণীয় কী- সে বিষয়েও আমাদের কমিউনিটি সচেতন না। আমাদের ওপেন স্পেসের এতো সংকট যে, ভূমিকম্প হলে আশ্রয় এবং উদ্ধারের বিষয়টিতেই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভোগাবে।
এই নগর ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে পুরান ঢাকা এবং বসুন্ধরার মতো এলাকা। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অধিকাংশ ভবনই গড়ে উঠেছে এক একটি ভবনের লাগোয়া এবং সেগুলোর যেমন ভিত্তি ঠিক নেই, তেমনি অনেক ভবনই পুরনো। আর বসুন্ধরার মতো নরম ভূমির এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এ জন্য ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মেনে যথাযথভাবে ভবন উঠছে কি না, সে বিষয়ে রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভূমিকম্প-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। কমিউনিটি বেইজড প্রিপারেশনটা বেশি জরুরি। মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে, কোথায় চিকিৎসা নেবে, কোন রাস্তা ব্যবহার করবেÑ সে বিষয়ে আগ থেকেই প্রস্তুতি থাকতে হবে। গড়ে তুলতে হবে কমিউনিটি বেইজড একটি উদ্ধারকারী দল।
ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে সে বিষয়েও ধারণা দেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে সরকারকে অনুরোধ করেন। বিষয়গুলো হচ্ছে-বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি; বর্তমান যে ভবন রয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা; ভূমিকম্প হওয়ার পরে কীভাবে পরবর্তী হ্যাজার্ড থেকে রক্ষা পাবে তার পরিকল্পনা এবং ভবন নির্মাণের এলাকার মাটি অনুযায়ী ভিত তৈরি করা।
যদিও ভূমিকম্প মোকাবিলায় গতকাল ফায়ার সার্ভিস এক সতর্কবার্তায় বলেছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ অনুযায়ী ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরনো ভবনগুলোর সংস্কার ও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, সব বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নি-প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা, ইউটিলিটি সার্ভিস, যেমন : গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন ঠিকঠাক আছে কিনা তা নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পর্যায়ে বিভিন্ন করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত মহড়া অনুশীলন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা, জরুরি টেলিফোন নম্বর যেমন ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি নম্বর ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি সব ভবন বা স্থাপনায় সংরক্ষণ করা এবং তা দৃশ্যমান স্থানে লিখে রাখা, ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দুর্যোগকালীন কার্যকর ভূমিকা রাখার পরামর্শ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সরঞ্জামাদি, যেমন : টর্চলাইট, রেডিও (অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ), বাঁশি, হাতুড়ি, হেলমেট/কুশন, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী, ফার্স্ট এইড বক্স, শিশু যত্নের সামগ্রী ইত্যাদি বাসা-বাড়িতে নির্ধারিত স্থানে সংরক্ষণ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি রাজউকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪০.২৮ থেকে ৬৫.৮৩ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে সময়ভেদে প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপক হতে পারে-ভোরে হলে ২.১ থেকে ৩.১ লাখ, দুপুরে ২.৭ থেকে ৪ লাখ এবং রাতে হলে ৩.২ থেকে ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে, সিলেটে যদি ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ঢাকায় ৪০,৯৩৫ থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ভবন অর্থাৎ মোট ভবনের ১.৯১ শতাংশ থেকে ১৪.৬৬ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাজউকের আওতায় ঢাকায় মোট ভবনের সংখ্যা ২১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি, যার মধ্যে ৫ লাখ ১৪ হাজার কংক্রিটের তৈরি। রাজউকের জরিপ করা ৩,২৫২টি ভবনের মধ্যে ৪২টিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত বছর, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্থকোয়াক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সিসমোলজির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মোহসেন ঘাফোরি আশতিয়ানি জানান, মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪৯.৬ শতাংশ প্রধান সড়ক, ৫৯.৪ শতাংশ নগর সড়ক, ৯৬.২২ শতাংশ প্রধান সেতু এবং ৯৬.৭৯ শতাংশ পর্যন্ত নগর সেতু ধসে পড়তে পারে।
আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে তিনি জানান, পরিবহন খাতে ক্ষতি হবে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনে ৮৮৭ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ২৭.১ মিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে অপরিকল্পিত ও দুর্বল ভবন, বস্তি এবং সরু গলিতে ঠাসাঠাসি করে মানুষ বসবাস করছে, যা ঢাকায় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকির মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। শহরের অনেক ভবন ভূমিকম্প প্রতিরোধে নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে নির্মাণ করা হয়নি, ফলে সেগুলো বড় ধরনের কম্পনে মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারে। এছাড়া, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নরম ও জলাবদ্ধ পলিমাটির ওপর গড়ে ওঠায়, প্রবল ভূকম্পনে এই মাটি সহজেই নরম হয়ে ভবন ধসের ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া জাপান বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশে জনসচেতনতা ও দক্ষ দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ মো. রুবায়েত কবির বলেন, আমরা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আছি। এমনকি দেশের বাইরের ভূমিকম্পও ঢাকায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভবনগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী হওয়া উচিত, আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি থাকতে হবে।
ব্রেকিং নিউজ
উচ্চঝুঁকিতে ঢাকা চট্টগ্রাম সিলেট ময়মনসিংহ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা এবং বসুন্ধরা
বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকতে বাংলাদেশ
-
মাহমুদুল করিম খান - প্রকাশ : ০১:২৪:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫
- ১৫৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
জনপ্রিয়

















