জুলাই বিপ্লবের আগে মাগুরা শ্রীপুর উপজেলার নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও কতিপয় সদস্য এবং প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট স্কুল তহবিল থেকে ৪ কোটি টাকার বেশি লোপাট করেছে। স্কুলের খোদ প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ নিয়মবহির্ভূত। এছাড়া স্কুলের টাকায় ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনাসহ দশটির বেশি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তদল।
এ বিষয়ক ২২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন গত ১২ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জমা দেন। সেখানে অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে জুলাই বিপ্লবের পর স্কুলে নতুন সভাপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়ে প্রধান শিক্ষক মান্নানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করতে পারে। এছাড়া চাকরি হারাতে পারেন অনিয়মে জড়িত একাধিক শিক্ষক।
তদন্তদল ২৭ জুলাই সরেজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে তদন্ত করে। মোট ১৪টি অভিযোগ খতিয়ে দেখে তারা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সাবেক ও বর্তমান প্রধান শিক্ষকসহ গভর্নিং বডির কয়েকজন সদস্য যোগসাজশে বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক প্রধান শিক্ষক এ. এস. এম. রফিকুল আলা,সাবেক গভর্নিং বডির সভাপতি হুমাইনুর রশিদ মুহিত, সদস্য সুব্রত বিশ্বাস পারস্পরিক যোগসাজসে একাধিক খাতে প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অন্যদিকে, বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক শেখ আ. মান্নানের বিরুদ্ধে প্রায় ২৯ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে।
তদন্ত দলের ভাষায়, “বিদ্যালয়টির আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠিত অনিয়মের চক্র সক্রিয় ছিল।” তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক শেখ আ. মান্নানের নিয়োগ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ই সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ মুহিত নতুন গভর্নিং বডি গঠন করে তাকে নিয়োগ দেন, যা স্পষ্টতই বিধিবহির্ভূত।
একইভাবে সহকারী শিক্ষিকা সুবর্ণা জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়। অর্থনৈতিক খাতে একের পর এক গরমিল ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিল থেকে অন্তত আরও ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৪৫২ টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে রেকর্ডপত্র ও ভাউচার গায়েব থাকায় তদন্ত দল মনে করছে, প্রকৃত অনিয়মের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলা অবসরের আগে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র গায়েব করে দেন। অবসর নেওয়ার সময় তিনি পরবর্তী প্রধান শিক্ষকের কাছে কোনো আয়–ব্যয়ের দলিল হস্তান্তর করেননি। তার মেয়াদে রেজুলেশন ছাড়াই ব্যাংক থেকে ৫১ লাখ টাকা উত্তোলন করে সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ মুহিতের ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ১ লাখ ৪ হাজার টাকা বিতরণ ছাড়াই তোলা হয়। দোকান ভাড়া বাবদ ৬৩ হাজার ৯০০ টাকা এবং সাধারণ তহবিলের ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা –এরও কোনো হিসাব মেলেনি। বিদ্যালয়ের ক্যাশ বহিতে একাধিক জায়গায় অঙ্কের গরমিল পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির সদস্য শিক্ষা পরিদর্শক মো. জহিরুল ইসলাম ও অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
তাঁরা বিদ্যালয়ের সব আর্থিক রেকর্ড দ্রুত উদ্ধার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছেন।
দেশ প্রতিবেদক 
















