পুরান ঢাকার ইসলামবাগের সড়কগুলো খুবই সরু। কিছু সড়ক এমন যে, একটা মানুষ ঠিকমতো হেঁটে যেতেও পারে না। এসব গলির ভেতর গেলে দেখা মিলবে একতলা দুইতলা পাকা বাড়ি, তার ওপর বাঁশ-টিন-কাঠের তিন-চার তলা ঘর করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
পুরো ইসলামবাগ ঘুরে দেখা গেছে, সরু গলিগুলোর বেশির ভাগ বাড়িতে আবাসিক ও কারখানা ভাড়া দেওয়া। অধিকাংশ ভবনের নিচতলা ও দোতলায় কেমিক্যালের গোডাউন ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা। ভবনের ওপরে অন্য তলাগুলোতে কেউ পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। আর ভবনগুলো এতটাই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে যে বেশিরভাগ গলিতেই ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করা অসম্ভব।
ইসলামবাগের এই সরু গলিগুলোতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে ওঠা প্লাস্টিকের কারখানা, কেমিক্যাল বা বিভিন্ন পণ্যের গুদামে প্রতি বছরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি হচ্ছে। সমস্যাগুলো উঠে আসছে, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।
বুধবারও ইসলামবাগের একটি প্লাস্টিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বেলা দেড়টার দিকে চেয়ারম্যানঘাট এলাকার প্লাস্টিকে গুদামে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সেখানে আগুন নেভাতে যায় ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট। আগুন নেভাতে গিয়ে বরাবরের মতই বিপত্তিতে পড়েন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। নানা ঝুঁকি আর প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে আড়াই ঘন্টা পর বিকেল ৪টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সার্বিক পরিস্থিত তুলে ধরেন ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. সালেহ উদ্দিন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখানে যে রকমভাবে ভবন করা হয়েছে, এগুলো বিল্ডিংয়ের কোনো জাতেই পড়ে না। এখানকার ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট গুলো একটু দেখুন। রাস্তাগুলো এত সরু যে একটা মানুষ ঠিকমতো হেঁটে যেতে পারে না। এসব কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের অনেক ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব ঝুঁকি আর প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে আমরা ৪টার দিকে আগুনটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। তবে আগুন এখনো পুরোপুরি নেভেনি। ভেতরে আমাদের ফায়ার ফাইটাররা কাজ করছে।
হতাহতের কোনো তথ্য মেলেনি জানিয়ে তিনি বলেন, আগুন নেভার পর আমরা পুরো এলাকা সার্চ করব। তারপরে বলতে পারব আসলে কী কারণে আগুনটা লেগেছিল। আর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটা তদন্ত কমিটি করা হবে।
যেখানে আগুন লেগেছে, সেটা আবাসিক এলাকা না বাণিজ্যিক-এমন প্রশ্নে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা সালেহ উদ্দিন বলেন, আপনি আমার চোখ দিয়ে দেখেন, সেইফটির চোখ দিয়ে দেখেন, আবাসিক এলাকার চোখে দেখেন…। আমরা ঢাকায় থাকি। এটা কি আবাসিক এলাকা না বাণিজ্যিক এলাকা? এগুলো আসলে কী ধরনের বিল্ডিং? নিচতলায় ইটের গাঁথুনি দিয়ে পাকা করা, আর ওপরে টিন দিয়ে চারতলা পর্যন্ত উঠানো হয়েছে। কোন মানুষ, কোন বিবেক নিয়ে এই ধরনের বিল্ডিং তৈরি করে এবং ভাড়া দেয় তা আমরা বুঝি না।
তিনি বলেন, এগুলো বিল্ডিংয়ের কোনো শ্রেণিতেই পড়ে না। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এর কথা যদি বলি, যদি সেইফটির কথা বলি, তাহলে বলতে হয় এগুলো বিল্ডিংয়ের কোনো জাতেই পড়ে না। এগুলোতে যারা বসবাস করছেন, তাদের অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই এখানে থাকতে হয়।
এখানকার প্লাস্টিকের কারখানাগুলো সবই অবৈধ। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, আসলে এগুলা প্লাস্টিকের কারখানা না গুদাম, নাকি দোকান, না খেলনার দোকান এগুলো কিছুই ডিফাইন করা যাবে না। কোথাও প্লাস্টিকের দানা বিক্রি করে, কোথাও পলিথিন কেটে কেটে কিছু জিনিসপত্র তৈরি করে-এগুলোকে আপনি দোকান, গুদাম বা ফ্যাক্টরি কোনো ক্যাটাগরিতেই ফেলতে পারবেন না।
ফায়ার সার্ভিসের উপ পরিচালক বলেন, সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাছের ফায়ার স্টেশন লালবাগ থেকে ফায়ার সার্ভিসের দল এখানে আসে। এখানে আসার পর আগুনের ভয়াবহতা দেখে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেসেজ দিলে আশপাশের পলাশী, সিদ্দীক বাজার, সদরঘাট ফায়ার স্টেশন থেকে ইউনিট এখানে মুভ করানো হয়। ছয়টা স্টেশনের মোট ১১টা ইউনিট এখানে কাজ করেছে। অগ্নি নির্বাপন শেষে আমাদের সার্চ টিম কাজ করবে, এরপরে আসলে আমরা বলতে পারব কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা।
ইসলামবাগের অলিগলিতে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যে সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য যে বিপদ ডেকে আনছে, তা এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ, এখানে এতটাই অপরিকল্পিতভাবে ভবন গড়ে উঠেছে যে বেশিরভাগ গলিতেই ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করা অসম্ভব। অধিকাংশ ভবনের নিচতলা ও দোতলায় কেমিক্যালের গোডাউন ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা। ভবনের ওপরে অন্য তলাগুলোতে আবাসিক ব্যবস্থা। আগুনে পুড়ে যাওয়া ওই ভবনের আশপাশের প্রায় সবগুলো ভবনেই রয়েছে প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা।
পশ্চিম ইসলামবাগের একটি সরু গলিতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, একটি ভবনের নিচতলায় প্লাস্টিক গুঁড়া করার কাজ চলছে। এই গলি দিয়ে কোনো গাড়ি প্রবেশ করা তো দূরের কথা, আগুন লাগলে দ্রুত সরে পড়াটাও কঠিন।
এ গলির একটি মোড়ে দেখা গেল দুইটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার স্থাপন করা। এর সাথের বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো পাশের ভবনগুলোর সাথে একেবারেই লাগোয়া।
কয়েকটি কারখানার কর্মচারীরা জানান, তারা কেউ দেড় দুই বছর ধরে এখানে বিভিন্ন কারকানায় কাজ করছেন। ঝুঁকি থাকলেও পেটের দায়ে কাজ করা। এখানকার কারখানায় বিভিন্ন কেমিক্যাল রয়েছে। যদি কোনোভাবে আগুন লাগে, তবে তাদের বের হওয়াটাই কঠিন হয়ে যাবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, ইসলামবাগ ও চকবাজার এলাকায় ছোট-বড় কারখানাগুলো সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। তাদের কথা- এসব প্রতিষ্ঠান ও এখানকার সরু গলিগুলো মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে এসব এলাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এখান থেকে স্থানান্তরও করা যাচ্ছে না।
রাজউকের দাবি, পুরান ঢাকাকে সংস্কারের পরিক
দেশ প্রতিবেদক 
















